আমরা সবাইকে সচেতন করতে পারব না, ভাই। কারণ, আমরা যত কথাই বলি না কেন, এখানে একটা জটিল সমস্যা আছে।

সমস্যাটা হল, মনে করেন, ঝিনাইদহের দুইজন ডাক্তার আছে। আমার ডায়াবেটিসের কথাই আপনাদের বলি। মনে করেন, ডায়াবেটিসের কারণে আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম। দুইজন ডাক্তারের কাছে। একজন ডাক্তার একটু ক্ষ্যাপাটে। সে আমাকে বলল, ‘ঔষধপাতি খেয়ে টাকা নষ্ট করেন না। ঔষদের পেছনে টাকা নষ্ট করেন না। আপনি এই এই নিয়মে চলবেন। প্রতিদিন, সকালে অন্তত একঘণ্টা হাঁটবেন। এই জিনিসগুলো কখনো খাবেন না। আর এইগুলো এইভাবে খাবেন। এই নিয়ম মেনে চলেন, ইনশাআল্লাহ রোগ কন্ট্রোল হয়ে যাবে। মাঝেমাঝে বেশি হলে, এই একটা বড়ি দিলাম, একটাকা বা দুই টাকার, এটা খেয়ে নেবেন।’

আর একজন ডাক্তার ভদ্র টাইপের।

সে বলল, ‘নিয়ম মানা তো ভালো, কিন্তু মেনে চলা তো কঠিন। অসুবিধা নেই, যা খুশি খাবেন, হাঁটতে পারলে ভালো, না পারলেও অসুবিধা নেই। আপনি আমার এই প্রতিদিন দুইশ টাকার ইঞ্জেকশনটা নিবেন। আর একমুঠ করে ঔষধ খাবেন। আর দুই তিন মাস পরে এসে আমার কাছে চেকআপ করে যাবেন।’ চেকআপের নামে ডাক্তার সাহেব, বেশি না, এই হাজার দশেক টাকা নিয়ে যাবেন।

এই দুই ডাক্তারের ভেতরে আমরা কিন্তু ওই দ্বিতীয় ডাক্তারকে পছন্দ করি। সকালে প্রতিদিন একঘণ্টা করে হাঁটা, এটা কি হয় না কি!! খাওয়া, আল্লাহ মুখটা দিয়েছেন, খাওয়ার জন্য! এটা-সেটা খাব, বিরিয়ানি, মিষ্টি খাব, এ কি আর বেছে চলা যায়! এর চেয়ে বরং একটু টাকা খরচ করে ঔষধ বেশি করে খাই। আর দুই/তিন মাস পরে ডাক্তারের দশ হাজার করে টাকা দিই, এটাই বরং আরামদায়ক।

এই রকম বাঙালি কিন্তু বাংলাদেশে অভাব নেই। আর এই কারণে, আমরা ঔষধ বেশি খাই, নিয়ম কম মানি।

দীনের ক্ষেত্রেও কিন্তু আমরা একই রকম।

দীনের ক্ষেত্রে মাসআলা-মাসায়িল হুযুররা দুই রকম দেয়। ক্ষ্যাপাটে হুযুর যারা আছে, তারা বলে,‘হুযুরদের পেছনে তেমন ঘুরো না। কুরআন পড়ো, হাদীস পড়ো। আর যখন প্রয়োজন হয়, তখন হুযুরদের কাছ থেকে মাসআলা শুনে নিয়ো। আর নিজে নামাযটা পড়ো, হালাল খাও। সৎ হয়ে চলো, ইনশাআল্লাহ, জান্নাত পাবে।’ আর যারা বুদ্ধিমান হুযুর, তারা বলবে, ‘না, এইগুলো তো সব ঠিক আছে, কিন্তু এইগুলো তো মানা কঠিন! পারলে মানেন, আর না মানলে অসুবিধা নেই। আমার এই ওযীফাটা বা এই মুস্তাহাব আমলটা সকাল-সন্ধ্যায় করবেন, আর আমাদের মাঝেসাঝে কৌশলে বছরে দুই চারবার দাওয়াত দেবেন, হাদিয়া দেবেন, ইনশাআল্লাহ, আমরা আছি।’

আমরা বাংলাদেশের মানুষ এই দ্বিতীয় ধরনের হুযুরদেরকেই বেশি মহাব্বত করি। নিজে জীবনটা হালাল পন্থায় মেনে চলব, স্বাভাবিক পন্থায় চলব- এর চেয়ে বরং হুযুরের, ডাক্তারের কিছু পয়সা দিলাম, ঔষধ একটু বেশি করে খেলাম; মনে করলাম, এতেই সব ঠিক হয়ে যাবে!

কিন্তু এটা হয় না, ভাই।

এই চিকিৎসকের চিকিৎসা আপনাকে ক্ষতি করছে, হুযুরের ওযীফা এবং এই খেদমত আপনার ক্ষতি করছে, আপনার কোনো লাভ করছে না। চিকিৎসকের পকেট ভরছে।

তো এই জন্যই কষ্ট লাগে। আমরা যখন বলি, আপনারা হারাম উপার্জন করবেন না, তখন মনে করেন, ‘এটা কি সম্ভব!?’ অথচ এর চেয়ে সহজ কিছু নেই। বিশেষ করে আপনারা যারা মসজিদে আসেন, তাদের জন্য। 

আমাদের দেশের যারা উচ্চবিত্ত,

হারাম খাওয়ার শত দরজা যাদের সামনে খোলা, তারা তো এত মসজিদে আসেন না। তারা বছরে দুই/চার লাখ টাকা হুযুরদের দেন, আর আশা করেন, হুযুররা যেভাবে দুআ করেন, তাদের জন্য (আখিরাতে) তেমন সমস্যা হওয়ার কথা না!

কিন্তু আপনারা হুযুরদেরকে এভাবে লাখ লাখ টাকা দিতেও পারেন না, এই রকম খালেস দুআও আপনারা পান না। একজন লোক একজন হুযুরের কাছে এসে যখন বিশ হাজার টাকা দেয়, তখন হুযুর তার জন্য যত অন্তর থেকে দুআ করবে, আপনি তাকে দশটাকা হাদিয়া দিলে সেভাবে করব না কি! এটা তো হবে না। তো আপনাদের জন্য হুযুরদের এই জানভরা দুআও এত সহজ না। আবার হারাম উপার্জন যে করবেন, এটাও আপনাদের জন্য এত সহজ না। সারাদিন খাটলে হয়তো দুইশ টাকা হারাম উপার্জন করবেন। আর অনেক মানুষ আছে, কলমের একটা খোচা মেরে দুইকোটি টাকা আয় করে।

তাহলে আমরা কেন হারামে যাব?

কষ্ট করে হালাল উপার্জন করব। বিশ্বাস করেন, আল্লাহ হালালে বরকত দেবেন। আল্লাহর সাথে বিজনেস সবচেয়ে সহজ, ভাই। আমরা অন্যদের সমালোচনা করছি না, নিজেদের সমালোচনা করি। আমাদের ভেতরে যেন হারাম না ঢোকে।

আমার ইচ্ছার বাইরে ভুল হয়ে গেছে, বুঝি নি, চেষ্টা করেছি, আল্লাহ এটা ধরবেন না। কিন্তু আমার ইচ্ছার ভেতরে সব সময় চেষ্টা করতে হবে। আমার দ্বারা আল্লাহর হক সংক্রান্ত গোনাহ হোক (তাওবা করলে আল্লাহ হয়তো ক্ষমা করবেন), কিন্তু বান্দার হক সংক্রান্ত গোনাহ যেন না হয়।

এইজন্য ভাইয়েরা,

আমাদের হালাল-হারামের চেতনাটাকে একটু সঠিক করতে হবে। আমরা ব্যাঙ খাওয়া নিয়ে অনেক ঝগড়াঝাটি করি। ব্যাঙ, কাঁকড়া, কুঁচে, কচ্ছপ নিয়ে কত টেনশন। কিন্তু আমাদের যে অরিজিনাল হারাম, উপার্জনের হারাম; আমাদের পেটে যেন হারাম উপার্জন না ঢোকে- এটা নিয়ে আমরা অত সচেতন নই।

যাই হোক, ভাইয়েরা, এটা আমাদের স্থায়ী সমস্যা। অন্তত আপনারা যারা মসজিদে আছেন, আমাদের যাদের হারাম উপার্জন করা কঠিন, উপার্জন মূলতই হালাল, তারা একটু সচেতন থেকে এটাকে শতভাগ হালাল রাখার চেষ্টা করি।

ইচ্ছার বাইরে বুঝতে পারি নি,

ভুলভ্রান্তি হয়েছে, আল্লাহ হয়তো ক্ষমা করবেন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:

لَا يُكَلِّفُ اللهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.

কারোর সাধ্যের বাইরে আল্লাহ চাপিয়ে দেবেন না।1সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬। তুমি চেষ্টা করেছ; এর বাইরে হয়তো, জানার বাইরে ভুল হয়েছে। আল্লাহ এটা ধরবেন না। তবে তোমার ইচ্ছায় যেন কোনো অবৈধ উপার্জন তোমার পেটে না ঢোকে।

তাহলে আমরা খাওয়ার মূল আদবগুলো মোটামুটি বুঝলাম, যেগুলো ফরয আদব।2অন্য দুটি ফরয আদব ‘অহংকার ও অপচয়’ সম্পর্কে বিগত খুতবায় আলোচনা করা হয়েছে।

 

বই : মিম্বারের আহ্বান-১

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রাহিমাহুল্লাহ।

 
  • 1
    সূরা [২] বাকারাহ, আয়াত: ২৮৬।
  • 2
    অন্য দুটি ফরয আদব ‘অহংকার ও অপচয়’ সম্পর্কে বিগত খুতবায় আলোচনা করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।