ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর অধ্যাপক, আল-হাদীস বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া চেয়ারম্যান, আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট

জনাব ডা. আব্দুল ওয়াহাব আমাদেরকে দুটি প্রশ্ন করেন। তাঁর প্রথম প্রশ্নটি ছিল: সকল ধর্মানুসারীই দাবি করেন যে, তাঁর ধর্মই সঠিক বা শ্রেষ্ঠ, তাহলে ইসলামের সঠিকত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার উপায় কী? আর তার দ্বিতীয় প্রশ্ন: কুরআনে হূরের বিষয়টি কি কুরআনের ভাবগাম্ভিয্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়?
এ প্রশ্নের একটি সংক্ষিপ্ত উত্তর ইমেইলের মাধ্যমে তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে বিষয়টি যে, আমাদের অনেকেরই কৌতুহল বা আগ্রহের বিষয় এজন্য আমরা সকলের জন্য হুবহু উত্তরটি প্রকাশ করলাম।

মুহতারাম ডা. আব্দুল ওয়াহাব সমীপেষু
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
আমি আসলেই আপনার প্রশ্নগুলোর কথা ভুলে গিয়েছিলাম। নানাবিধ ব্যস্ততাই কারণ। আপনার মেইল দেখে মনে পড়ল।
প্রথম প্রশ্ন: সকল ধর্মানুসারীই দাবি করেন যে, তাঁর ধর্মই সঠিক বা শ্রেষ্ঠ, তাহলে ইসলামের সঠিকত্ব বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার উপায় কী? ধর্ম কী ও কেন এ দুটি প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই এ উত্তর নিহিত।

প্রথমত: সকল ধর্মানুসারীর মতেই ধর্ম হলো ঐশ্বরিক (ফরারহব) ব্যবস্থা যা মহান স্রষ্টা ওহীর বা ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে কোনো রাসূল বা ধর্মপ্রবর্তকের মাধ্যমে মানব জাতিকে প্রদান করেছেন। এজন্য যে কোনো ধর্মের ধর্মগ্রন্থ (ংপৎরঢ়ঃঁৎব) রয়েছে। ধর্মের সাথে ধর্মগ্রন্থের তুলনা করলেই কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ তা সহজে বুঝা যায়।

বিশ্বের অধিকাংশ ধর্মগ্রন্থের সাথে সেই ধর্মের তুলনা করলেই আমরা দেখি যে, ধর্মানুসারীদের ধর্মের সাথে ধর্মগ্রন্থের ধর্মের মিল খুবই কম। বাইবেলের বিধিবিধান ও ধর্মবিশ্বাসের সাথে চার্চের খৃস্টধর্মের তুলনা করলে এবং বেদ-গীতার সাথে প্রচলিত হিন্দু ধর্মের তুলনা করলেই তা নিশ্চিত জানা যায়। অর্থাৎ প্রচলিত ধর্মগুলোর ধর্মগ্রন্থই প্রমাণ করে যে, তাদের প্রচলিত বা আচরিত ধর্ম বিশ্বাস সঠিক নয়। তারা ধর্মগ্রন্থের অধিকাংশ নির্দেশনা পালন করেন না, বরং বিপরীত চলেন ও ধর্মগ্রন্থ নিষিদ্ধ বিষয়কে ধর্ম বলে বিশ্বাস করেন। খৃস্টধর্মের ত্রিত্ববাদ, প্রায়শ্চিত্ববাদ, মূলপাপতত্ত্ব, কর্মহীন বিশ্বাসেই মুক্তির তত্ত্ব ইত্যাদি কোনো কিছুই বাইবেলে নেই, বরং বাইবেলে এর বিপরীত বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। প্রচলিত বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়ম নিশ্চিত প্রমাণ করে যে, সাধু পল প্রচারিত ও বর্তমান খৃস্টজগত আচরিত খৃস্টধর্ম নামক ধর্মটি সঠিক নয়। হিন্দু ধর্ম ও অন্যান্য ধর্মের ক্ষেত্রেও বিষয়টি প্রায় একইরূপ।

ইসলাম ধর্মের বিষয়টি একেবারেই ব্যতিক্রম। প্রচলিত ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান, বিশ্বাস ও আচার আচরণ সবই কুরআন ভিত্তিক ও কুরআন সমর্থিত। মুসলিমগণ ধর্ম কতটুকু পালন করেন সেটি ভিন্ন কথা। তবে কুরআন নির্দেশিত কোনো অধর্মকে তারা ধর্ম হিসেবে বিশ্বাস বা পালন করেন না।

শুধু তাই নয়। বিশ্বের সকল ধর্মগ্রন্থই প্রমাণ করে যে, ইসলামই সঠিক ধর্ম। সকল ধর্মের প্রচলিত বিশ্বাস ও কর্মের মধ্যে এমন অনেক বিষয় বিদ্যমান যা সে ধর্মের ধর্মগ্রন্থ ছাড়াও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ নিন্দনীয় বলে ঘোষণা করেছে। পক্ষান্তরে ইসলামী ধর্ম বিশ্বাস ও ধর্মীয় কর্মের মধ্যে এমন একটি বিষয়ও নেই যা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ নিন্দনীয় বলে ঘোষণা করেছে। সাধারণত ইসলাম বিরোধীগণ জিহাদ ও নারী অধিকারের মত দু-একটি বিষয় উত্থাপন করতে চান যে, এগুলো অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের আলোকে ‘খারাপ’ বা অন্যায়। তাঁদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন না করার কারণে অথবা সত্য গোপনের জন্য তারা এ কথা বলেন। প্রকৃত সত্য হলো, বাইবেল, বেদ, গীতা, মহাভারত, রামায়ণ ইত্যাদি সকল ধর্মগ্রন্থে বিদ্যমান জিহাদ ও নারী অধিকারের অবস্থা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। ধর্মগ্রন্থগুলোর নির্দেশনায় ইসলামই এ দুটি বিষয়ে সর্বোচ্চ মানবিকতা ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। এভাবে আমরা দেখছি যে, প্রত্যেক ধর্মের সাথে সে ধর্মের ধর্মগ্রন্থের তুলনামূলক অধ্যয়ন এবং সকল ধর্মগ্রন্থের মূল শিক্ষার সাথে প্রচলিত সকল ধর্মের তুলনামূলক অধ্যয়ন প্রমাণ করে যে, ইসলামই একমাত্র সঠিক ধর্ম।

দ্বিতীয়ত: সকল ধর্মানুসারীই বিশ্বাস বা দাবি করেন যে, ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষকে সত্যিকার সৎ মানুষে পরিণত করা। এ দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে তুলনা করলেও কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ তা সহজেই জানা যায়। বস্তুত নিয়মিত সুষম খাদ্যগ্রহণ ও স্বাস্থ্যসম্মত নিয়মে না চলে সপ্তাহে, মাসে বা বছরে অল্পবেশি ভিটামিন, মহা-পুষ্টিকর খাদ্য বা ঔষধ গ্রহণ করে প্রকৃত দৈহিক সুস্থতা অর্জন করা যায় না। তেমনি নিয়মিত সুষম বিশ্বাস, ইবাদত ও পাপমুক্ত পবিত্র জীবন যাপন না করে মাঝে মাঝে আনুষ্ঠানিকতা করে প্রকৃত আত্মিক সুস্থতা, পবিত্রতা ও সততা অর্জন করা যায় না।

আর এ দিক থেকে একমাত্র ইসলামই জীবনঘনিষ্ট ধর্ম যা ধার্মিক মানুষকে প্রকৃত সৎ মানুষে পরিণত করে। ইসলাম ধর্মের বিধিবিধান এমন যে, মহান আল্লাহর সাথে সার্বক্ষণিক প্রেমের ও স্মরণের সম্পর্ক তৈরি হয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামায, সাপ্তাহিক নামায, রোযা, যাকাত, দৈনন্দিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইবাদত ইত্যাদি পালনের মাধ্যমে নিয়মিত বাধ্যতামূলক আত্মীক-আধ্যাত্মিক অনুশীলন অব্যাহত থাকে। এজন্য ধর্ম পালনকারী ধার্মিক মুসলিম সমাজের অন্যদের তুলনায় অধিকতর সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত হন। পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে তিনি অপেক্ষাকৃত অধিক সচেতন হন।

অন্যান্য ধর্মে এরূপ নিয়মিত ইবাদত ও অনুশীলন অনুপস্থিত বা ঐচ্ছিক। ফলে মানুষ মহান আল্লাহর সাথে নিয়মিত প্রেমের সম্পর্ক থেকে বঞ্চিত। হিন্দু ধর্মে বর্ণপ্রথার কারণে সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু মূলত ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন ও ইবাদত পালনের সকল সুযোগ থেকেই বঞ্চিত। হিন্দু ধর্ম মূলত খাওয়া- না খাওয়া, ও কিছু আচার-অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এখানে বিশ্বাস, সততা, কর্ম, বিধিবিধান, আধ্যাত্মিকা ইত্যাদি গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সাধু পলের খৃস্টধর্মের কর্মহীন বিশ্বাস, বিশ্বাসে মুক্তি ও পাপমোচন তত্ত্বের কারণে দুর্নীতি, ব্যভিচার, যৌন নিপীড়ন, মাদকতা ইত্যাদি বিষয় ধার্মিক খৃস্টান ও পোপ-পাদরিদের মধ্যেই ব্যাপক, অধার্মিক খৃস্টানদের তো কথাই নেই। এখানেও ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসই মূল, দুর্নীতি মুক্ত হওয়া, মাদকমুক্ত হওয়া, জুলুম মুক্ত হওয়া ইত্যাদির কোনো মূল্য নেই। সকলের জন্যই মুক্তি নিশ্চিত। দুনিয়ার আইন কোনো রকমে ফাঁকি দিতে পারলেই হলো। ফলে কেউ আল্লাহর প্রেম অর্জন বা তাঁর অসন্তুষ্টি বর্জনের আকাঙ্খায় পাপ, জুলুম, ব্যভিচার, অনাচার, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি বর্জন করেন না। কেউ তা করলে একান্তুই আইনের ভয়ে করেন। আর আইনের ভয় প্রকৃত সৎ মানুষ তৈরি করে না, বরং বকধার্মিক ও ঠক তৈরি করে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন: কুরআনে হূরের বিষয়টি কুরআনের ভাবগাম্ভিয্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রথমত: এ বিষয়টি যিনি বলেছেন তিনি সম্ভবত কুরআন অধ্যয়ন করেন নি। কুরআনে হুরের বিষয়টির সাথে যৌনতা, দৈহিক সম্পর্ক ইত্যাদির সামান্যতম আবেশ নেই। বারংবার বলা হয়েছে যে, ‘তাদেরকে জোড়া বানিয়ে দেওয়া হবে হুরের সাথে’। আরবী ও অন্যান্য লিঙ্গ সচেতন ভাষায় সাধারণ বিধিবিধানে পুংলিঙ্গ ব্যবহার করেই বিধিবিধান প্রদান করা হয়। এরপরও হুর শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ নয়। নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আর মানবীয় প্রকৃতির সাথে একটি সুসমঞ্জস। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে আত্মা ও মনের শান্তির জন্য জোড়া চায়। জান্নাতে মহান আল্লাহ তাদেরকে জোড়া প্রদান করবেন; যেন তারা মানবীয় প্রকৃতির প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তির পূর্ণতা লাভ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত: এ বিষয়টি যিনি বলেছেন তিনি সম্ভবত অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থও অধ্যয়ন করেন নি। বাইবেল, বেদ, রামায়ন, মহাভারত ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি পর্নোগ্রাফিকেও হার মানায়। পিতা-কন্যার ব্যভিচার, ভাই-বোনের ভ্যবিচার, শ্বশুর-পুত্রবধুর ব্যভিচার, পিতার স্ত্রীদের প্রকাশ্যে ধর্ষণ, উলঙ্গ হয়ে নাচানাচি, মাতলামি ইত্যাদির বর্ণনায় পবিত্র বাইবেল পরিপূর্ণ। সাধারণ বিষয়ের বর্ণনাতেও অশ্লীল উপমা ও রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। পক্ষান্তরে কুরআনে স্বাভাবিক যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ক বর্ণনাও সকল অশ্লীতার ছোয়া থেকে মুক্ত।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ইহূদী, খৃস্টান, হিন্দু বা অন্য ধর্মের কোনো কোনো অনুসারী নিজেদের ধর্মগ্রন্থের অপবিত্রতম পর্নোগ্রাফীর চেয়েও অশ্লীল গল্পগুলোকে ধর্মগ্রন্থের ভাবগাম্ভির্যের সাথে সাংঘর্ষিক মনে না করলেও কুরআনের মধ্যে বিদ্যমান অশ্লীলতা বা দৈহিকতার সামান্যতম ছোয়ামুক্ত হুর বিষয়ক বক্তব্যগুলোকে ধর্মগ্রন্থের ভাবগাম্ভীর্যের সাথে অসমঞ্জস বলে দাবি করেন।

তাড়াহুড়ো করে বিষয়দুটো লিখলাম। আল্লাহ আপনাকে ভাল রাখুন। ওয়াস সালামু আলাইকুম।
আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর