As-Sunnah Trust

প্রশ্নোত্তর

ক্যাটাগরি

প্রশ্নোত্তর 982

প্রশ্ন

আসসালামু আলাইকুম! ইসলামে পায়ে ধরে সালাম করার নিয়ম আছে কী? কাউকে না করলেও নিজের মা বাবাকে করা যাবে কী বা কাকে করা যাবে? কারণ মায়ের পায়ের নিচে তো সন্তানের বেহেশত। কোরআন ও হাদীসের আলোকে জানা্লে উপকৃত হবো।

উত্তর

এই বিষয়ে শায়খ ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীল রহ. এ্হইয়াউস সুনান বইয়ে বলেছেন, কদমবুসীর রীতি: একজন মুসলমানের সাথে অন্যের দেখা হলে সালাম দেওয়া বা আস-সালামু আলাইকুম বলা ও উত্তর প্রদান করা ইসলামী সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ সা. -এর দরবারে তাঁর ২৩ বৎসরের নবুয়তী জিন্দেগিতে তাঁর লক্ষাধিক সাহাবীর কেউ কেউ দুই একবার এসেছেন। কেউ কেউ সহস্্রাধিকবার এসেছেন। এসকল ক্ষেত্রে তাঁদের সুন্নাত ছিল সালাম প্রদান। কখনো কখনো দেখা হলে তাঁরা সালামের পরে হাত মিলিয়েছেন, বা মুসাফাহা করেছেন। দুএকটি ক্ষেত্রে তাঁরা একজন আরেক জনের হাতে বা কপালে চুমু খেয়েছেন বা কোলাকুলি করেছেন। যয়ীফ বা অনির্ভরযোগ্য কয়েকটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনায় দেখা যায় কেউ রাসূলুল্লাহ সা. -এর পায়ে চুমু খেয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সা. ২৩ বৎসরের নবুয়তী জিন্দেগিতে লক্ষ মানুষের অগণিতবার আগমনেরে ঘটনার মধ্যে মাত্র ৪/৫টি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সেই বর্ণনাগুলি প্রায় সবই যয়ীফ বা দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য। এ সকল ঘটনায় কোনো সুপরিচিত সাহাবী তাঁর পদচুম্বন করেননি, করেছেন নতুন ইসলাম গ্রহণ করতে আসা কয়েকজন বেদুঈন বা ইহুদি, যারা দরবারে থাকেনি বা দরবারের আদব ও সুন্নাত জানত-না। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, ফাতেমা, বেলাল (রা) ও তাঁদের মতো অগণিত প্রথম কাতারের শত শত সাহাবী প্রত্যেকে ২৩ বৎসরে কমপক্ষে ১০ হাজার বার তাঁর দরবারে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু কেউ কখনো একবারও তাঁর কদম মুবারকে চুমু খাননি বা সেখানে হাত রেখে সেই হাতে চুমু খাননি। কাজেই উপরোক্ত ৩/৪টি ব্যতিক্রম ঘটনার আলোকে বড়জোর পায়ে চুমু খাওয়া জায়েয বলা যেতে পারে। আমরা বলতে পারি বিশেষ ক্ষেত্রে আবেগের ফলে বা ক্ষমা চাওয়ার জন্য যদি কেউ কারো পা জড়িয়ে ধরে বা পায়ে চুমু খায় তা না-জায়েয হবে না। কিন্তু এই লক্ষ লক্ষ ঘটনার মধ্যে ব্যতিক্রম ৩/৪ টি ঘটনাকে যদি আমরা সুন্নাত মনে করি তাহলে নিঃসন্দেহে তা মূল সুন্নাতকে নষ্ট করবে। যা আমাদের সমাজে ঘটছে। অনেককেই মুখে সালাম দেওয়ার চেয়ে কদমবুছির গুরুত্ব বেশি প্রদান করি। অনেকে কদমবুছিকেই সালাম করা বলি। অনেকে মুখে সালাম প্রদান করি-না শুধু কদমবুছি করি। একবার চিন্তা করুন। রাসূলুল্লাহ সা. -এর ২৩ বৎসরের নবুয়তী জীবনের প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অগণিত ভক্ত সাহাবী তাঁর দরবারে আসছেন। দরবারে বসে আছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা., আল্লাহর মহত্ত্বম শ্রেষ্ঠতম খলীল ও হাবীব, যার ভক্তি ও ভালবাসা আল্লাহর কাছে নাজাতের অন্যতম ওসীলা। তাঁর দরবারে আসছেন মানব ইতিহাসের অতুলনীয় ভক্তবৃন্দ, যারা জীবনের ঊর্ধ্বে ভালবেসেছেন, ভক্তি করেছেন ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন রাসূলুল্লাহ সা. -কে। এই দরবারের এসব আগন্তুকের কেউই কদমবুসী বা কমদমুছি করছেন না। সবাই এসে সালাম দিয়ে দরবারে বসছেন। সালাম দিয়ে দরবার ত্যাগ করছেন। কখনো হয়ত মোসাফাহা হচ্ছে। এই হলো দরবারে নববী। ২৩ বৎসরের দরবারে শুধুমাত্র তিন চার জন্য নবাগত, দরবারের সুন্নাতের সাথে অপরিচিত মানুষ পায়ে চুমু খেয়েছেন বলে কোনো কোনো হাদীসে জানা যায়। এবার আমাদের একটি দরবার বা মাজলিস চিন্তা করি। দরবারে বসে আসেন একজন ধর্মীয় নেতা, দরবারে প্রতিদিন আসছেন অগণিত ভক্ত। প্রতিটি আগন্তুক আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সালাম করছেন, মুসাফাহা করছেন, এরপর হাতে বা পায়ে চুমুখাচ্ছেন। প্রতিটি আগন্তুক বা অধিকাংশ আগন্তুক ভক্তির প্রাবল্যে ও মুক্তির আকুতিতে নেতার পদযুগর স্পর্শ করে নিজেকে ধন্য করছেন।দুটি দরবারের চিত্র কি এক হলো? একজন সুন্নাত প্রেমিক সুন্নী মুসলিমের মনে কি কষ্ট লাগবে-না যে রাসূলে আকরামের সা. দরবারের সুন্নাত নষ্ট হয়ে মৃত্যবরণ করছে দেখে। আমাদের কেউ হয়ত বলবেন : অসুবিধা কি? সালাম তো প্রচলিত আছেই। আমরা শুধু অতিরিক্ত একটি জায়েয কাজ প্রচলন করেছি। সুন্নাত প্রেমিকের কাছে অনেক অসুবিধা আছে। জায়েয কাজকে সুন্নাত বা রীতিতে পরিণত করার ফলে রাসূলুল্লাহ সা. -এর দরবারের সুন্নাতটি মৃত্যুবরণ করেছে। তাঁর দরবারের পরিপূর্ণ সুন্নাতটি এখন অর্ধেক সুন্নাতে পরিণত হয়েছে। তাঁর ১৬ আনা আমাদের কাছে ৮ আনা হয়ে গেল! আমরা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছি যে, এ সকল দরবারে বা সমাজের কোথাও যদি কেউ যদি নবীজির সা. দরবারের পরিপূর্ণ সুন্নাতের উপর আমল করে, অর্থাৎ সাহাবীদের মতো শুধু সালাম করে দরবারে বসে পড়ে বা মাঝে মাঝে মুসাফাহা করে, তাহলে তাকে শুধু অপূর্ণ নয় বরং খারাপ মনে করা হবে। এখন চিন্তা করুন আমরা রাসূলুল্লাহ সা. -এর সুন্নাত অপছন্দ করার ক্ষেত্রে কোথায় চলে গেছি! হয়ত আমাদের কারো একথাও মনে হতে পারে : কী আশ্চর্য, শ্রেষ্ঠ নবী, শ্রেষ্ঠ হাদী, শ্রেষ্ঠ মুরশিদ আল্লাহর খলীল ও হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা., যার ভক্তি ও ভালবাস ঈমান ও নাজাত তাঁকে কদমবুছি বা কদমমুছি করছেন-না আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, আবু হুরাইরা, সালমান, আবু দারদা, বিলাল ও অগণিত মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণ (রাদিআল্লাহু আনহুম), এমনকি তাঁর আহলে বাইত, তাঁর কলিজার টুকরা সন্তানগণ, ফাতেমা, হাসান, হুসাইন কেউই তাঁর কদমবুছি বা কদম মুছি করছেন না। তাঁরা আবার কেমন ভক্ত, কেমন মুহেব্বীন? লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ! প্রথম যুগের মহান অনুসারীরা সুন্নাত ও জায়েযের পার্থক্য বুঝতেন। সুন্নাতের স্তর বুঝতেন। সাহাবীদের দরবার দেখুন। আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, হাসান, হুসাইন (রাদিআল্লাহু আনহুম) প্রমুখ হাজার হাজার সাহাবীর দরবার দেখুন। সালামই পরিপূর্ণ সুন্নাত। উপরের দুই চারিটি ঘটনার উপর নির্ভর করে কোথাও তাঁরা পায়ে চুমু খাওয়ার প্রচলন করেননি। প্রথম যুগের তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের অবস্থাও তা-ই ছিল। এহইয়াস সুনান, পৃষ্ঠা, ৩৮৬-৩৮৮। পিতা-মাতার ক্ষেত্রেও একই হুকুম। আল্লাহ তায়ালা ভাল জানেন।