কুফর ও তাকফীর

আজ রবিউল আউয়াল মাসের ২য় জুমুআ। আজকের খুতবায় আমরা কুফর বা অবিশ্বাস বিষয়ে আলোচনা করব, ইনশা আল্ল­াহ। কিন্তু তার আগে আমরা এ সপ্তাহের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসগুলির বিষয়ে সংক্ষেপ আলোকপাত করি।
…………………………………………………………………………………………………..

গত কয়েক খুতবায় আমরা ঈমান সম্পর্কে জানতে পেরেছি। ঈমান বা বিশ্বাসের বিপরীত ‘অবিশ্বাস’। কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঈমান থেকেই কুফরী জন্মেছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঈমানের নামেই কুফরী প্রচারিত হয়েছে। ইহূদী, খৃস্টান ও আরবের মুশরিকগণ মূলত আসমানী কিতাব বা ওহী এবং আল্ল­াহর মনোনীত নবী-রাসূলদের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হন এবং কুফরীতে লিপ্ত হন। এজন্য ঈমানদারদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা দরকার এবং এ বিষয়ে ভাল জ্ঞান অর্জন করা দরকার।

কুরআন ও হাদীসের আলোকে অবিশ্বাসের প্রকাশ তিন প্রকার: (১) কুফর, (২) শিরক ও (৩) নিফাক। ‘কুফর’ শব্দের অর্থ আবৃত করা, অবিশ্বাস করা বা অস্বীকার করা। আমরা ইতোপূর্বে ঈমানের যে বিষয়গুলি জেনেছি সেগুলির কোনো একটি অবিশ্বাস, সন্দেহ বা দ্বিধা করাই কুফর। রব্ব হিসেবে আল্ল­াহর একত্ব, মা’বুদ হিসেবে আল্লাহর একত্ব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্যবাদিতা, নিষ্কলুষ চরিত্র, নিষ্পাপ ব্যক্তিত্ব, তাঁর নুবুওয়াতের বিশ্বজনীনতা, নুবুওয়াতের সমাপ্তি, তাঁর আনুগত্য অনুকরণের বাধ্যবাধকতা, তাঁর শিক্ষার বিশুদ্ধতা, পূর্ণতা, অন্যান্য নবী রাসূলের নবুবওয়াত বা নিষ্পাপত্ব, আখিরাত বিষয়ক প্রমাণিত কোনো বিষয়, তাকদীরের বিষয়ে প্রমাণিত কোনো বিষয় বা ঈমানের যে কোনো প্রমাণিত বিষয় অস্বীকার, অবিশ্বাস, দ্বিধা বা সন্দেহ করলে তা কুফরী বলে গণ্য হবে।

অনুরূপভাবে মহান আল্ল­াহ ছাড়া অন্য কাউকে কোনো বিষয়ে তাঁর সমতুল্য বা সমকক্ষ বা তাঁর সাথে তুলনীয় বলে বিশ্বাস করার মাধ্যমে আল্ল­াহর একত্ব ও অতুলনীয়ত্ব অস্বীকার করাও কুফর। তবে এ পর্যায়ের কুফরকে ইসলামী পরিভাষায় র্শিক বলা হয়।

কুরআন বা সুন্নাত দ্বারা ব্যাখ্যাতীতভাবে প্রমাণিত কোনো বিধান অবিশ্বাস বা অস্বীকার করা কুফ্রী। সালাত, যাকাত, সিয়াম ইত্যাদির ফরয হওয়া অস্বীকার করা, ব্যভিচার, চুরি, হত্যা ইত্যাদির হারাম হওয়া অস্বীকার করা, সালাতের তাহারাত, রাক‘আত, সময়, সাজদা, রুকুু ইত্যাদির পদ্ধতি অস্বীকার বা ব্যতিক্রম করা এ পর্যায়ের কুফ্র। তবে অজ্ঞতার কারণে অস্বীকার করলে তা ওযর বলে গণ্য হতে পারে। কোনো ইজতিহাদী বা ইখতিলাফী বিষয় অস্বীকার করলে তা কুফ্র বলে গণ্য হবে না।

কোনো প্রকার কুফ্রে সন্তুষ্ট থাকা কুফ্র। অনুরূপভাবে ইসলামের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকাও কুফ্র। যেমন আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অপছন্দ করা, ইসলামের বিধান বলে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত কোনো কিছু প্রতি বিরক্তি বা ঘৃণা পোষণ করা, ইসলামের কোনো নির্দেশ বা শিক্ষা অচল, সেকেলে বা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করা কুফর। অনুরূপভাবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা বৈধ মনে করা কুফ্র। যদি কেউ আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা পাপ ও অন্যায় জেনেও প্রবৃত্তি বা শয়তানের প্ররোচনায় বা জাগতিক কোনো স্বার্থে আল্লাহর বিধান অমান্য করে, আল্লাহর বিধানের বিপরীতে চলে, চালায় বা বিধান দেয় সে পাপী বলে গণ্য। কিন্তু কেউ যদি মনে করে ‘মারিফাত’ হাসিল হয়ে যাওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তির জন্য আল্লাহর বিধান বা শরীয়তের ব্যতিক্রম করা বৈধ, অথবা মনে করে যে, যুগের প্রেক্ষাপটে ইসলামের অমুক বিধানটি মানা জরুরী নয় বা কুরআনের অমুক নির্দেশনাটি আর কার্যকর নয়, অথবা কুরআনের নির্দেশনার বিপরীত চলা, চলানো বা বিধান দেওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই তবে সে ব্যক্তি কাফির বলে গণ্য। তিনি যদি ইসলামের কিছু বিধান পালন করেন তবুও তিনি কাফির বলে গণ্য হবেন। কারণ আল্লাহর কোনো একটি নির্দেশ অপছন্দ করা কুফর। মহান আল্লাহ বলেন:

وَالَّذِينَ كَفَرُوا فَتَعْسًا لَهُمْ وَأَضَلَّ أَعْمَالَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ
“যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ এবং তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন। তা এজন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিবেন।”[1]সূরা (৪৭) মুহাম্মাদ: ৮-৯ আয়াত। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
“আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না তারাই কাফির।”[2]সূরা (৫) মায়িদা: ৪৪ আয়াত।

অনুরূপভাবে ইসলামের কোনো প্রমাণিত বিষয় নিয়ে হাসি-তামাশা বা উপহাস করা অথবা যারা এরূপ করে তাদের সাথে অবস্থান করা বা তাদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক রাখা। মহান আল্লাহ বলেন:

وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آَيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
“তুমি যখন দেখ, তারা আমার আয়াত সম্বন্ধে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন হয় তখন তুমি দূরে সরে পড়বে, যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসংগে প্রবৃত্ত হয়। এবং শয়তান যদি তোমাকে ভ্রমে ফেলে তবে স্মরণ হওয়ার পরে জালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসবে না।”[3]সূরা (৬) আন‘আম: ৬৮ আয়াত।

অমুসলিম বা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত কাফির, নাস্তিক, মুরতাদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সাথে আন্তরিক ভালবাসার সম্পর্ক রাখাও কুফরী। তবে এদের সাথে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা ডিপ্লোম্যটিক সম্পর্ক রাখা যাবে। কুরআনে বিষয়টি বারংবার বলা হয়েছ। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:

لا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللَّهِ فِي شَيْءٍ إِلا أَنْ تَتَّقُوا مِنْهُمْ تُقَاةً
“মুমিনগণ যেন মুমিনগণ ব্যতীত কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করে। যে কেউ এরূপ করবে তার সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক থাকবে না। তবে ব্যতিক্রম, যদি তোমরা তাদের নিকট হতে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর।”[4]সূরা (৩) আল-ইমরান: ২৮ আয়াত।

যে ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী, তার দল বা দলের নেতাকে যারা নিন্দা করে তাদের সাথে এ ব্যক্তি কখানোই আন্তারিক বন্ধুত্ব গড়তে পারে না। সামাজিকভাবে মিশলেও মনের মধ্যে দূরত্ব থাকবেই। আপনার দীন কি রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে বড় নয়? যে ব্যক্তি আপনার মহান রব্বকে, তাঁর মহান রাসূলকে বা তাঁর প্রমাণিত কোনো শিক্ষাকে অস্বীকার বা উপহাস করছে তার প্রতি যদি আপনার মনের বিরাগ ও কষ্ট না থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনি তার কুফরীতে সুন্তুষ্ট আছেন। আপনার রবের বা নবীর অবমাননায় আপনার কোনো কষ্ট হয় না। এরপরও কি আপনি নিজেকে মুমিন বলবেন?

ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম অনুসরণ করে কেউ মুক্তিলাভ করতে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে বা আখেরাতে জান্নাত লাভ করতে পারে বলে মনে করা কুফরী। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الإِسْلامُ
“ইসলাম আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন।”[5]সূরা (৩) আল-ইমরান: ১৯ আয়াত।
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الإِسْلامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الأخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল করা হবে না এবং সে হবে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।”[6]সূরা (৩) আল-ইমরান: ৮৫ আয়াত।

ইসলামই সর্বপ্রথম সকল ধর্মের অনুসারীদের শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের স্বীকৃতি দিয়েছে। ইহূদী-খুস্টানদের বাইবেলে অন্য ধর্মের অনুসারীদের নির্বিচারে হত্যা করতে, প্রতারণামূলকভাবে দাওয়াত দিয়ে এনে হত্যা করতে ও তাদের উপাসনালয়গুলি ভেঙ্গে ফেলতে। অন্যান্য জাতিদেরকে কুকুর, শূকর ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং অকথ্যভাষায় গালি দেওয়া হয়েছে।[7]বাইবেল, গীতসংহিতা ১৪৯/৬-৯, দ্বিতীয় বিবরণ ২০/১৩-১৬; যাত্রা পুস্তক ২২/২০, … Continue reading হিন্দু ধর্মে অন্য ধর্মের অনুসারীদের যবন, ম্লেচ্ছ ইত্যাদি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তাদেরকে অস্পৃশ্য বানানো হয়েছে। এমনকি তাদের ছায়া পর্যন্ত মাড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে ইসলামে অন্য সকল ধর্মের অনুসারীদের সাথে ভাল ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে বা তাদের উপাস্যদেরকে গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে। তাদের সাথে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের সকল সামাজিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সকল যুগে মুসলিম দেশগুলিতে অমুসলিম নাগরিগণ সর্বোচ্চ অধিকার ও শান্তির সাথে বসবাস করেছেন। মধ্যযুগে এবং আধুনিক যুগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইউরোপে খৃস্টান রাষ্ট্রগুলিতে ইহূদীদের উপর সর্বদা জুলুম করা হয়েছে। আইন করে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইউরোপে একমাত্র মুসলিম স্পেনে এবং মুসলিম তুরস্কে ইহূদীরা পরিপূর্ণ নাগরিক অধিকার সহ বাস করেছেন। জুইশ এনসাইক্লোপিডীয়া ও অন্যান্য সকল বিশ্বকোষ ও ইতিহাসগ্রন্থে এ সকল তথ্য রয়েছে।

কিন্তু অবস্থানের স্বীকৃতি এক বিষয় আর ধর্ম বিশ্বাসকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া অন্য বিষয়। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মবিশ্বাস অনুসরণ করে মুক্তি পাওয়া যাবে বা সকল ধর্মই ঠিক বলে বিশ্বাস করার অর্থই কুফরীকে সঠিক বলে বিশ্বাস করা ও কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াতকে অস্বীকার করা।

কুফরের একটি প্রকার হলো কুফরুন নিফাক বা মুনাফিকীর কুফরী। আরবীতে ‘নিফাক’ শব্দের অর্থ কপটতা (hypocrisy)। শব্দটির মূল অর্থ খরচ করা, চালু করা, গোপন করা, অস্পষ্ট করা ইত্যাদি।[8]ইবনু ফারিস, মু’জামু মাকাঈসিল লুগাহ ৫/৪৫৪-৪৫৫। নিফাকে লিপ্ত মানুষকে ‘মুনাফিক’ বলা হয়। ইসলামী পরিভাষায় নিফাক দুই প্রকার: (১) বিশ্বাসের নিফাক ও (২) কর্মের নিফাক। অন্তরের মধ্যে অবিশ্বাস গোপন রেখে মুখে বিশ্বাসের প্রকাশকে বিশ্বাসের নিফাক বা নিফাক ই’তিকাদী বলা হয়। এরূপ নিফাক কুফরেরই একটি প্রকার; কারণ এরূপ নিফাকে লিপ্ত ব্যক্তির অন্তরে অন্যান্য কাফিরের মতই অবিশ্বাস বিদ্যমান, যদিও সে জাগতিক স্বার্থে মুখে ঈমানের দাবি করে। অথবা প্রথমে দেখাদেখি ঈমান এনেছে, কিন্তু পরে অন্তরে দ্বিধা ও অবিশ্বাস ঢুকেছে, কিন্তু জাগতিক স্বার্থে নিজেকে মুমিন বলে দাবি করে। এদের বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لا يَفْقَهُونَ
“তা এ জন্য যে, তারা ঈমান আনার পর কুফরী করেছে, ফলে তাদের হৃদয়ে মোহর করে দেওয়া হয়েছে, পরিণামে তারা বোধশক্তি হরিয়ে ফেলেছে।”[9]সূরা (৬৩) মুনাফিকূন: ৩ আয়াত।

দ্বিতীয় পর্যায়ের নিফাক হলো, কর্মের নিফাক। অর্থাৎ এরূপ কর্ম শুধু মুনাফিকরাই করে বা তাদের জন্যই শোভা পায়। এরূপ কর্মের বর্ণনায় এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ
“চারটি বিষয় যার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে সে নির্ভেজাল মুনাফিক। আর যার মধ্যে এগুলির মধ্য থেকে কোনো একটি স্বভাব বিদ্যমান থাকবে তার মধ্যে নিফাক বা কপটতার একটি দিক বিদ্যমান থাকবে, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে: (১) যখন তার কাছে কিছু আমানত রাখা হয় সে তা খিয়ানত করে, (২) যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা বলে, (৩) যখন সে চুক্তি বা প্রতিজ্ঞা-বদ্ধ হয় তখন তা ভঙ্গ করে এবং (৪) যখন সে ঝগড়া করে তখন সে অশ্লীল কথা বলে।”[10]বুখারী, আস-সহীহ ১/২১, ৩/১১৬০; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৭৮।

কুফরের অন্যতম দিক হলো শিরক, অর্থাৎ কাউকে কোনো বিষয়ে আল্লাহর সমকক্ষ বা শরীক সাব্যস্ত করে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের বা ইবাদতের একত্ব অস্বীকার বা অবিশ্বাস করা। হাযেরীন কুরআন ও হাদীসে বারংবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, কুফর ও শিরক হলো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পাপ। অন্যান্য ভয়ঙ্কর মহাপাপের সাথে কুফর-শিরকের মহাপাপের চারটি পার্থক্য রয়েছে:

প্রথমত, কুফর-শিরক হলো ভয়ঙ্করতম মহাপাপ। কুরআন-হাদীসে বিষয়টি বারংবার বলা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, অন্য সকল পাপ আল্লাহ তাওবার কারণে, অথবা তাওবা ছাড়াই নেক আমলের বরকতে বা বিশেষ দয়া করে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু শিরকের পাপ তিনি কখনোই ক্ষমা করেন না। কুফর-শিরক পরিত্যাগ করে বিশুদ্ধ ঈমান গ্রহণ ছাড়া এর ক্ষমা নেই। মহান আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا
“আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার অপরাধ ক্ষমা করেন না। তা ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এবং যে কেউ আল্লার সাথে শরীক করে সে এক মহাপাপ করে।”[11]সূরা (৪) নিসা: ৪৮ আয়াত।

তৃতীয়ত, শিরক-কুফরের কারণে মানুষের সকল নেক-আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন:
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, ‘তুমি আল্লাহর শরীক স্থির করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্ত’।”[12]সূরা (৩৯) যুমার: ৬৫ আয়াত। আল্লাহ আরো বলেন:
وَمَنْ يَكْفُرْ بِالإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
“কেউ ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”[13]সূরা (৫) মায়িদা: ৫ আয়াত।

চতুর্থত অন্য সকল মহাপাপে লিপ্ত ব্যক্তি বিনা তাওবায় মারা গেলেও তার জান্নাতে যাওয়ার আশা থাকে। জাহান্নামে শাস্তি ভোগের পরে, অথবা আল্লাহর বিশেষ করুণায় বা কারো শাফাআতে ক্ষমালাভের মাধ্যমে শাস্তি ছাড়াই সে ব্যক্তির জান্নাতে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু কুফর-শিরকে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য এরূপ কোনো আশা নেই। কেউ তার জন্য সুপারিশও করবেন না। আল্লাহ বলেন:
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ
“কেউ আল্লাহর শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ করবেন ও তার আবাস জাহান্নাম; জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।”[14]সূরা (৫) মায়িদা: ৭২ আয়াত।

আবূ যার (রা) বলেন, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মহান আল্লাহ বলেছেন:
مَنْ لَقِيَنِي بِقُرَابِ الأَرْضِ خَطِيئَةً لا يُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَقِيتُهُ بِمِثْلِهَا مَغْفِرَةً
“যে ব্যক্তি আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করে পৃথিবী পরিমাণ পাপ-সহ আমার সাথে সাক্ষাত করবে আমি সমপরিমাণ ক্ষমা-সহ তার সাথে সাক্ষাত করব।”[15]মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২০৬৮।

কোনো কর্মকে কুফ্র, শিরক, বা নিফাক বলা আর কোনো ব্যক্তিকে কাফির, মুশরিক বা মুনাফিক বলা কখনোই এক বিষয় নয়। যে ব্যক্তি নিজেকে মুমিন বা মুসলিম বলে দাবি করছেন তাকে কাফির বলা ভয়ঙ্কর বিষয়। কারণ, ঈমানের দাবিদারকে কাফির বলার বিষয়ে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মাতকে সতর্ক করেছেন। ইবনু উমার (রা), আবূ হুরাইরা (রা), আবূ যার (রা), আবূ সাঈদ (রা) সহ ৮/১০ জন সাহাবী থেকে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত প্রায় মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীসে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
إِذَا كَفَّرَ الرَّجُلُ أَخَاهُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا (إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلا رَجَعَتْ عَلَيْهِ)
“যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফির বলে, তবে এ কথা দু জনের একজনরে উপর প্রযোজ্য হবে। যদি তার ভাই সত্যিই কাফির না হয় তবে যে তাকে কাফির বলল তার উপরেই কুফরী প্রযোজ্য হবে।”[16]বুখারী, আস-সহীহ ৫/২২৬৩-২২৬৪; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৭৯। বিস্তারিত দেখুন: কুরআন … Continue reading

কোনো মুসলিমকে কাফির অথবা কাফিরের চেয়েও খারাপ ইত্যাদি বলার ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক হতে হবে। আমরা অনেক সময় ব্যাখ্যা করে কাফির বলি। যেমন বলি, অমুক ব্যক্তি অমুক কাজ করেছে বা অমুক কথা বলেছে বা অমুক মতাদর্শে বিশ্বাস করেছে কাজেই সে কাফির; কারণ উক্ত কথা দ্বারা মূলত অমুক অর্থ বুঝা যায় যা কুফরী বলে গণ্য…। হাযেরীন, ব্যাখ্যা করে কাফির নয়, ব্যাখ্যা করে মুসলিম বলতে উদগ্রীব হতে হবে। যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে মুসলিম বলে দাবিদার ব্যক্তির কথা বা মতের একটি ওজর বা ব্যাখ্যা করে তাকে মুসলিম বলে গ্রহণ করা। মুমিনের দায়িত্ব হলো, মুমিন নিজের ঈমানের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন। সকল কুফর, শিরক, পাপ ও ইসলাম বিরোধী চিন্তাচেতনা থেকে সতর্কতার সাথে আত্মরক্ষা করবেন। কিন্তু অন্যের ঈমানের দাবি গ্রহণ করার বিষয়ে বাহ্যিক দাবির উপর নির্ভর করবেন। কোনো ঈমানের দাবিদারকেই কাফির না বলার জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবেন। ভুল করে কোনো মু’মিনকে কাফির বলে মনে করার চেয়ে ভুল করে কোনো কাফির-মুশরিককে মুসলিম মনে করা অনেক অনেক ভাল ও নিরাপদ। প্রথম ক্ষেত্রে কঠিন পাপ ও নিজের ঈমান নষ্ট হওয়ার ভয় রয়েছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কোনোরূপ পাপ বা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ঈমান ও কুফর মূলত বিশ্বাস ও অন্তরের বিষয়, যা কথা, সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তির মাধ্যমে জানা যায়। কর্ম ঈমান বা কুফরের আলামত। এজন্য শুধু বাহ্যিক কর্ম দেখে কাউকে কাফির বা মুমিন বলা যায় না, বরং তার কর্মের পিছনের বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। একটি উদাহরণ আমরা আলোচনা করতে পারি। কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব বা আল্লাহর নির্দেশের ব্যতিক্রম চলা, চলানো, বিধান দেওয়া বা বিচার করা থেকে মুমিন সর্বতোভাবে আত্মরক্ষা করবেন। কিন্তু কোনো মুসলিম যদি এরূপ কিছু করেন তবে তাকে কাফির বলবেন না। বরং তার জন্য একটি ওজর চিন্তা করবেন। হয়ত না জেনে, জাগতিক স্বার্থে বা অন্য কোনো কারণে সে এরূপ করছে, সে পাপ করছে, তবে কুফরী করছে না। বিশেষ প্রয়োজন হলে তাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। তিনি হয়ত বলবেন: আমি উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কুফরীকে ঘৃণা করি, অথবা আল্লাহর বিধানের বিপরীত চলা, চলানো বা বিধান দেওয়া হারাম বলেই আমি জানি, তবে অমুক কারণে আমি এরূপ করেছি। এরূপ বললে তার কথা মেনে নিতে হবে এবং তাকে পাপে লিপ্ত মুসলিম বলে গণ্য করতে হবে। অথবা তিনি হয়ত বলতে পারেন, উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আমি ভাল মনে করি, অথবা সকল ধর্মই ঠিক, আমার ধর্ম আমি পালন করি, তার ধর্মের বা বিশ্বাসের প্রতি আমার কোনো আপত্তি নেই, অথবা ইসলামের অমুক বা তমুক বিধান বর্তমান যুগে পালনীয় নয়, এজন্যই আমি এরূপ করেছি। এরূপ বললে তিনি কুফরীতে লিপ্ত বলে গণ্য হবেন। তবে এক্ষেত্রে তাকে কাফির বলার আগে এরূপ বিশ্বাস যে কুফরী তা কুরআন ও হাদীসের আলোকে মহব্বতের সাথে তাকে বুঝাতে হবে।

অনেক সময় আমরা আধুনিক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মতাদর্শের কারণে মুসলিমকে কাফির বলে ফেলি। এ বিষয়েও অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। উক্ত রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে হয়ত কুফরী থাকতে পারে। কিন্তু ঈমানের দাবিদার মুসলিম ব্যক্তি জেনেশুনে উক্ত কুফরীতে বিশ্বাস করছেন না বলেই আমাদের মনে করতে হবে। তার জন্য ওজর চিন্তা করতে হবে। প্রয়োজনে তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে। তিনি তার কর্মের ব্যাখ্যা যা দিবেন সেটিই চূড়ান্ত বলে ধরতে হবে। ব্যাখ্যা করে কাফির বা মুশরিক বলার প্রবণতা ভয়ঙ্কর। কুরআন-সুন্নাহের আলোকে ব্যক্তির কর্মকে ‘পাপ’, ‘কুফর’ বা শিরক বলা সহজ বিষয়, কিন্তু ব্যক্তিকে কাফির বলার মত ভয়ঙ্কর ঝুকি মুমিন সর্বদা পরিহার করবেন।
আল্লাহ আমাদের ঈমানকে সকল কুফর, শিরক ও নিফাক থেকে মুক্ত রাখুন। আমীন।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, রাহিমাহুল্লাহ, বই: খুতবাতুল ইসলাম, পৃ. ১০৩-১১০।

তাওহীদুল ঈমান (৬), আল্লাহর পথের পথিকদের পাপ, ইসলামের ইতিহাসে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ: একটি পর্যালোচনা, আল্লাহর পথের পথিকদের পাপ (৫)হালাল উপার্জন ও হারাম বর্জন

ফুটনোটঃ

ফুটনোটঃ
1সূরা (৪৭) মুহাম্মাদ: ৮-৯ আয়াত।
2সূরা (৫) মায়িদা: ৪৪ আয়াত।
3সূরা (৬) আন‘আম: ৬৮ আয়াত।
4সূরা (৩) আল-ইমরান: ২৮ আয়াত।
5সূরা (৩) আল-ইমরান: ১৯ আয়াত।
6সূরা (৩) আল-ইমরান: ৮৫ আয়াত।
7বাইবেল, গীতসংহিতা ১৪৯/৬-৯, দ্বিতীয় বিবরণ ২০/১৩-১৬; যাত্রা পুস্তক ২২/২০, ২৩/২৩-২৪, ৩৪/১২-১৪, ১ শমূয়েল ২৭/৮-৯, ২ শমূয়েল ১২/২৯-৩১, ১ রাজাবলি ১৪/৮, ১৮/৪০, ২ রাজাবলি ১০/১৮-২৮, মথি ৭/৬, ১৫/২২-২৬।
8ইবনু ফারিস, মু’জামু মাকাঈসিল লুগাহ ৫/৪৫৪-৪৫৫।
9সূরা (৬৩) মুনাফিকূন: ৩ আয়াত।
10বুখারী, আস-সহীহ ১/২১, ৩/১১৬০; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৭৮।
11সূরা (৪) নিসা: ৪৮ আয়াত।
12সূরা (৩৯) যুমার: ৬৫ আয়াত।
13সূরা (৫) মায়িদা: ৫ আয়াত।
14সূরা (৫) মায়িদা: ৭২ আয়াত।
15মুসলিম, আস-সহীহ ৪/২০৬৮।
16বুখারী, আস-সহীহ ৫/২২৬৩-২২৬৪; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৭৯। বিস্তারিত দেখুন: কুরআন সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা ৫১৭-৫২২।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *