হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই: রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশ ও সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি

হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাই:
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশ ও সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি
ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর লিখিত
এ প্রবন্ধটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ৪৪ বর্ষ ৩য় সংখ্যা: জানুয়ারী-মার্চ ২০০৫ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

১. পূর্বকথা

কুরআনুর কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসই মুসলিম জীবনের পাথেয়। সকল মতের সকল মুসলিমই কুরআন ও হাদীসের উপর নির্ভর করতে চান এবং নিজেদের মতের পক্ষে কুরআন ও হাদীসের প্রমাণাদি পেশ করতে চেষ্টা করেন। তবে বর্তমান সমাজে হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে কিছু উৎকট অজ্ঞতা প্রসূত বিভ্রান্তি বিরাজমান।

অনেকেই মনে করেন ‘হাদীস’ মানেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী, কাজেই কোনো হাদীসকে দুর্বল বা অনির্ভরযোগ্য বলে মনে করা বা উল্লেখ করার অর্থ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা বা বাণীকে অবজ্ঞা করা। কেউ বা মনে করেন, যত দুর্বল বা যয়ীফই হোক, যেহেত হাদীস এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা কাজেই তাকে গ্রহণ ও পালন করতে হবে।

এই ধারণা নিঃসন্দেহে ভ্রান্ত ও অজ্ঞতা প্রসূত। তবে এর বিপরীতে এর চেয়েও মারাত্মক বিভ্রান্তি অনেকের মধ্যে বিরাজমান। অনেক অজ্ঞ মানুষ মনে করেন, হাদীস যেহেতু মৌখিকভাবে সনদ বা বর্ণনাকারীদের পরম্পরার মাধ্যমে বর্ণিত, কাজেই তার মধ্যে ভুলভ্রান্তি ব্যাপক। কাজেই হাদীসের উপর নির্ভর করা যাবে না। ইসলামের বিধিবিধান জানার জন্য শুধুমাত্র কুরআন কারীমের উপরেই নির্ভর করতে হবে।

প্রথম ধারণা সাধারণত অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে বিরাজমান। আর দ্বিতীয় বিভ্রান্তি অনেক শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবি বলে পরিচিত মানুষদের মধ্যে প্রসারিত। হাদীসের সনদ বিচার ও হাদীসের নির্ভরযোগ্যতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ ও পরবর্তী যুগের মুসলিম উম্মার শীর্ষস্থানীয় আলেম ও মনিষীগণের সুক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্মন্ধে অজ্ঞতাই এ সকল বিভ্রান্তির কারণ। এ বিষয়ের অস্পষ্টতা দূর করার জন্যই এই প্রবন্ধের অবতারণা।

আমরা দুইটি পর্যায়ে এই বিষয়ে আলোচনা করতে চাই। বর্তমান প্রবন্ধে আমরা হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নির্ভরতা নিশ্চিত করতে কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ ও তার আলোকে সাহাবীগণের কর্মধারা আলোচনা করব। পরর্বতী প্রবন্ধে আমরা হাদীসের সনদ বিচার ও বিধান প্রদানে মুহাদ্দিসগণের সামগ্রিক নিরীক্ষা পদ্ধতির ব্যাখ্যা করব। মহান আল্লাহর দরবারে তাওফীক প্রার্থনা করছি এবং তাঁরই রহমতের উপর নির্ভর করছি।

২. হাদীস পরিচিতি

হাদীস বলতে সাধারণত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কর্ম বা অনুমোদন বুঝানো হয়। যে কথা, কর্ম, অনুমোদন বা বিবরণকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বলে প্রচার করা হয়েছে বা দাবী করা হয়েছে তাই মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় “হাদীস” বলে পরিচিত। এছাড়া সাহাবীগণ ও তাবেয়ীগণের কথা, কর্ম ও অনুমোদনকেও হাদীস বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসাবে বর্ণিত হাদীসকে “মারফূ’ হাদীস” বলা হয।

সাহাবীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসাবে বর্ণিত হাদীসকে “মাউকূফ হাদীস” বলা হয়। আর তাবেয়ীগণের কর্ম, কথা বা অনুমোদন হিসাবে বর্ণিত হাদীসে “মাকতূ’ হাদীস” বলা হয়।[1]বিস্তারিত দেখুন: ইরাকী, যাইনুদ্দীন আব্দুর রাহীম ইবনুল হুসাইন (৮০৬হি), … Continue reading

এখানে লক্ষণীয় যে, যে কথা, কাজ, অনুমোদন বা বর্ণনা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বলে দাবী করা হয়েছে বা বলা হয়েছে তাকেই মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায় ‘হাদীস’ বলে গণ্য করা হয়। তা সত্যসত্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা কিনা তা যাচাই করে নির্ভরতার ভিত্তিতে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের বিভিন্ন প্রকারে বিভক্ত করেছেন।

৩. হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতা রক্ষার গুরুত্ব

“ওহী’ বা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদেশের মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞানই সকল ধর্মের মুল। ওহীলব্ধ জ্ঞান নষ্ট করার ফলেই পূর্ববর্তী সকল উম্মত ও জাতি বিভ্রান্ত হয়েছে। ওহীলব্ধ জ্ঞান নষ্ট হতে পারে মূলত দুইভাবে: ১. অবহেলা, মুখস্থ না রাখা বা অসংরক্ষণের ফলে ওহীলব্ধ জ্ঞান বা গ্রন্থ হারিয়ে যাওয়া বা বিনষ্ট হওয়া, ২. মানবীয় কথাকে ওহীর নামে চালানো বা ওহীর সাথে মানবীয় কথা বা জ্ঞানের সংমিশ্রণ ঘটানো।[2]বিস্তারিত দেখন: খোন্দকার আব্দুল­াহ জাহাঙ্গীর, কুরআন—সুন্নাহর আলোকে … Continue reading

প্রথম পর্যায়ে ‘ওহী’-র জ্ঞান একেবারে হারিয়ে যায়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘ওহী’ নামে কিছু ‘জ্ঞান’ সংরক্ষিত থাকে, যার মধ্যে ‘মানবীয় জ্ঞান ভিত্তিক’ কথাও সংমিশ্রিত থাকে। কোন কথাটি ওহী এবং কোন কথাটি মানবীয় তা জানার বা পৃথক করার কোনো উপায় থাকে না। ফলে ‘ওহী’ নামে সংরক্ষিত গ্রন্থ বা জ্ঞান মূল্যহীণ হয়ে যায়।

পূর্ববর্তী অধিকাংশ জাতি দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ওহীর জ্ঞানকে বিকৃত করেছে। ইহুদী, খৃস্টান ও অন্যান্য অধিকাংশ ধর্মাম্বলীদের নিকট ‘ধর্মগ্রন্থ’, উরারহব ংপৎরঢ়ঃঁৎব, এড়ফ’ং ডড়ৎফ ইত্যাদি নামে কিছু গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে। যেগুলির মধ্যে অগণিত মানবীয় কথা, বর্ণনা ও মতামত সংমিশ্রিত রয়েছে। ফলে সেগুলি থেকে মূল শিক্ষা উদ্ধার করার কোনো পথ নেই।

ইসলামে ওহীর জ্ঞান দুই প্রকার: আল-কুরআনুল কারীম ও হাদীসুর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত কুরআন কারীম হুবহু ওহীর শব্দে ও বাক্যে সংকলিত হয়েছে। হাদীস হলো ওহীর মাধ্যমে প্রদত্ত কুরআনের ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক জ্ঞান, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ভাষায় শিক্ষা দিয়েছেন।

ইসলামের এই দুই মুল উৎসকে রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ওহীর জ্ঞানকে হুবহু নির্ভেজালভাবে সংরক্ষণের জন্য একদিকে কুরআন ও হাদীসকে হুবহু শাব্দিকভাবে মুখস্থ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয় এমন কোনো কথাকে মহান আল্লাহ বা তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর নামে বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

৩. ১. ‘ওহী’-লব্ধ জ্ঞানের নির্ভুল ও নির্ভেজাল সংরক্ষণে কুরআনের নির্দেশ

‘ওহী’র নামে মিথ্যা, বানোয়াট বা অনুমান-নির্ভর কথা প্রচারের দুইটি পর্যায়: প্রথমত, নিজে ওহীর নামে মিথ্যা বলা ও দ্বিতীয়ত, অন্যের বলা মিথ্যা গ্রহণ ও প্রচার করা। উভয় পথ রুদ্ধ করার জন্য কুরআন কারীমে একদিকে আল্লাহর নামে মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। অপরদিকে কারো প্রচারিত কোনো তথ্য বিচার ও যাচাই ছাড়া গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

৩. ১. ১. আল্লাহর নামে মিথ্যা ও অনুমান নির্ভর কথা বলার নিষেধাজ্ঞা

কুরআন কারীমে মহান আল্লাহ বারংবার আল্লাহর নামে মিধ্যা বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে না-জেনে, আন্দাজে, ধারণা বা অনুমানের উপর নির্ভর করে আল্লাহর নামে কিছু বলতে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলার অর্থ আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকেই কথা বলেন। কুরআনের মত হাদীসও আল্লাহর ওহী।

কুরআন ও হাদীস, উভয় প্রকারের ওহীই একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে বিশ্ববাসী পেয়েছে। কাজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে কোনো প্রকারের মিথ্যা, বানোয়াট, আন্দাজ বা অনুমান নির্ভর কথা বলার অর্থই আল্লাহর নামে মিথ্যা বলা বা না-জেনে আল্লাহর নামে কিছু বলা। কুরআন কারীমে এ বিষয়ে বারংবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।[3]দেখুন: সূরা ২: আল— বাকারা: ৮০, ১৬৯; সূরা ৩: আল—ইমরান: ৯৪; সূরা ৪: আন—নিসা: ১৫৭; … Continue reading এখানে কয়েকটি বাণী উল্লেখ করছি।

১. কুরআন কারীমে বারংবার এরশাদ করা হয়েছে:
ومن أظلم ممن افترى على الله كذبا
“আল্লাহর নামে বা আল্লাহর সম্পর্কে যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে?”[4]সূরা ৬: আল—আন‘আম: ২১, ৯৩, ১৪৪; সূরা ৭: আল—আ’রাফ: ৩৭; সূরা ১০: ইউনূস: ১৭; সূরা ১১: … Continue reading

২. এরশাদ করা হয়েছে:`
ويلكم لا تفتروا على الله كذبا فيسحتكم بعذاب وقد خاب من افترى
“দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করো না। করলে, তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দ্বারা সমূলে ধ্বংস করিবেন। যে মিথ্যা উদ্ভাবন করেছে সেই ব্যর্থ হয়েছে।”[5]সূরা—২০: তাহা: আয়াত ৬১।

৩. কুরআন কারীমে বারংবার না-জেনে, আন্দাজে বা অনুমান নির্ভর করে আল্লাহ, আল্লাহর দ্বীন, বিধান ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন একস্থানে এরশাদ করা হয়েছে:
يا أيها الناس كلوا مما في الأرض حلالا طيبا ولا تتبعوا خطوات الشيطان إنه لكم عدو مبين. إنما يأمركم بالسوء والفحشاء وأن تقولوا على الله ما لا تعلمون

“হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পাবিত্র খাদ্যবস্ত রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“। সে তো কেবল তোমাদেরকে মন্দ ও অশ্লীল কার্যের এবং আল্লাহ সম্বন্ধে তোমরা যা জান না এমন সব বিষয় বলার নির্দেশ দেয়।[6]সূরা—২ আল—বাকারাহ: আয়াত ১৬৮—১৬৯।

৪. অন্যত্র এরশাদ করা হয়েছে:
قل إنما حرم ربي الفواحش ما ظهر منها وما بطن والإثم والبغي بغير الحق وأن تشركوا بالله ما لم ينزل به سلطانا وأن تقولوا على الله ما لا تعلمون
“বল, ‘আমার প্রতিপালন নিষিদ্ধ করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ এবং অসংগত বিরোধিতা এবং কোনো কিছুকে আল্লাহর শরীক করা- যার কোনো সনদ তিনি প্রেরণ করেন নি, এবং আল্লাহর সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যে সম্বন্ধে তোমাদের কোনো জ্ঞান নেই।”[7]সূরা ৭: আল—আ’রাফ: আয়াত ৩৩।

এভাবে কুরআন কারীমে ওহীর জ্ঞানকে সকল ভেজাল ও মিথ্যা থেকে রক্ষার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহিমাময় আল্লাহ, তাঁর মহান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর দ্বীন, তাঁর বিধান ইত্যাদি কোনো বিষয়ে মিথ্যা, বানোয়াট, আন্দাজ বা অনুমান নির্ভর কথা বলা কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

৩. ১. ২. যে কোনো তথ্য বা বক্তব্য গ্রহণের পূর্বে তা যাচাই করার নির্দেশ

নিজে আল্লাহ বা তাঁর মহান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অন্যের কোনো অনির্ভরযোগ্য, মিথ্যা বা অনুমান নির্ভর বর্ণনা বা বক্তব্য গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ। যে কোনো সংবাদ বা বক্তব্য গ্রহণে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছে কুরআন কারীম। এরশাদ করা হয়েছে:
يا أيها الذين آمنوا إن جاءكم فاسق بنبأ فتبينوا أن تصيبوا قوما بجهالة فتصبحوا على ما فعلتم نادمين.
“হে মুমিনগণ যদি কোনো পাপী তোমাদের নিকট কোনো বার্তা আনয়ন করে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্থ না কর, এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।”[8]সূরা—৪৯ আল—হুজুরাত : আয়াত ৬।

এই নির্দেশের আলোকে, কেউ কোনো সংবাদ, বক্তব্য, খবর, সাক্ষ্য বা তথ্য প্রদান করলে তা গ্রহণের পূর্বে সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত সততা ও তথ্য প্রদানে তার নির্ভুলতা যাচাই করা মুসলিমের জন্য ফরয বা অত্যাবশ্যক। জাগতিক সকল বিষয়ের চেয়েও বেশি সতর্কতা ও পরীক্ষা করা প্রয়োজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়ক বার্তা বা বাণী গ্রহণের ক্ষেত্রে।

কারণ জাগতিক বিষয়ে ভুল তথ্য বা সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করলে মানুষের সম্পদ, সম্ভ্রম বা জীবনের ক্ষতি হতে পারে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বা ওহীর জ্ঞানের বিষয়ে অসতর্কতার পরিণতি ঈমানের ক্ষতি ও আখেরাতের অনন্ত জীবনের ধ্বংস। এজন্য মুসলিম উম্মাহ সর্বদা সকল বার্তা, হাদীস, বর্ণনা পরীক্ষা করে গ্রহণ করেছেন।

৩. ২. হাদীসের বিশুদ্ধতা সংরক্ষণ ও যাচাইয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নির্দেশ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাণী ও শিক্ষার নির্ভুল সংরক্ষণের জন্য উপরে উল্লিখিত বিকৃতির পথ দুইটি রোধের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর বাণী ও শিক্ষা বা হাদীস যেন পরবর্তী সকল উম্মতের নিকট হুবহু ও নির্ভুল ভাবে পৌঁছায় ও সংরক্ষিত থাকে সে জন্য তিনি উম্মাতকে তাঁর “হাদীস” বা বাণী ও শিক্ষা হুবহু মুখস্থ করতে নির্দেশ ও উৎসাহ প্রদান করেছেন। অপরদিকে তাঁর বাণীর মধ্যে অন্য কোনো মানবীয় কথা বা মতামত যেন প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য উম্মতকে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন।

৩. ২. ১. বিশুদ্ধরূপে হাদীস মুখস্থ রাখতে ও প্রচার করতে নির্দেশ

বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাদীস বা বাণী হুবহু বিশুদ্ধরূপে মুখস্থ করে তা প্রচার করতে নির্দেশ দিযেছেন। জুবাইর ইবনু মুতয়িম (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
نضر الله عبدا (وجه عبد) سمع مقالتي (حديثا) فوعاها (وحفظها) ثم أداها إلى من لم يسمعها

“মহান আল্লাহ সমুজ্জল করুন সেই ব্যক্তির চেহারা যে আমার কোনো কথা শুনল, অতঃপর তা পূর্ণরূপে আয়ত্ত্ব করল ও মুখস্থ করল এবং যে তা শুনেনি তার কাছে তা পৌঁছে দিল।” এই অর্থে আরো অনেক হাদীস অন্যান্য অনেক সাহাবী থেকে বর্ণিত ও সংকলিত হয়েছে।[9]তিরমিযী, মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা (২৭৯ হি), আস—সুনান (বৈরুত, লেবানন, দারু এহইয়াইত … Continue reading

৩. ২. ২. রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নামে মিথ্যা কথা বলার নিষেধাজ্ঞা

অপরদিকে কোনো মানবীয় কথা যেন তাঁর নামে প্রচারিত হতে না পারে সেজন্য তিনি তাঁদেরকে তাঁর নামে মিথ্যা বা অতিরিক্ত কথা বলতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হযরত আলী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
لا تَكْذِبُوا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ [يَكْذِبْ] عَلَيَّ فَلْيَلِجِ النَّارَ

“তোমরা আমার নামে মিথ্যা বলবে না; কারণ যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে।”[10]বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল (২৫৬হি), আস—সহীহ (বৈরুত, দারু কাসীর, ইয়ামাহ, … Continue reading

যুবাইর ইবনুল আউয়াম (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
من كذب علي فليتبوأ مقعده من النار
“যে ব্যক্তি আমার নামে মিথ্যা বলবে তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম।”[11]বুখারী, আস—সহীহ ১/৫২।

সালামাহ ইবনুল আকওয়া (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
من يقل علي ما لم أقل فليتبوأ مقعده من النار
“আমি যা বলিনি সে কথা যে আমার নামে বলবে তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম।”[12]বুখারী, আস—সহীহ ১/৫২।

এভাবে ‘আশারায়ে মুবাশশারাহ’-সহ প্রায় ১০০ জন সাহাবী এই মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাবধান বাণী বর্ণনা করেছেন। আর কোনো হাদীস এত বেশি সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়নি।[13]নববী, ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ (৬৭৬হি), শারহু সাহীহ মুসলিম (বৈরুত, দারু … Continue reading

৩. ২. ৩. বেশি হাদীস বলা ও মুখস্থ ছাড়া হাদীস বলার নিষেধাজ্ঞা

বেশি হাদীস বর্ণনা করতে গেলে ভুলের সম্ভাবনা থাকে। এজন্য এ বিষয়ে সতর্ক হতে উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বিশুদ্ধ মুখস্থ ও নির্ভুলতা সম্পর্কে পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কোনো হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন।

১. আবু কাতাদাহ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বারের উপরে দাঁড়িয়ে বলেন,
إِيَّاكُمْ وَكَثْرَةَ الْحَدِيْثِ عَنِّيْ! فَمَنْ قَالَ عني فَلْيَقُلْ حَقًّا وَصِدْقًا (فلا يقل إلا حقا) وَمَنْ تَقَوَّلَ (قال) عَلَيَّ مَا لَمْ أقُلْ فَلْيَتَبَوَّأ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

“খবরদার! তোমরা আমার নামে বেশি বেশি হাদীস বলা থেকে বিরত থাকবে। যে আমার নামে কিছু বলবে, সে যেন সঠিক কথা বলে। আর যে আমার নামে এমন কথা বলবে যা আমি বলিনি তাকে জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।”[14]ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১৪; আলবানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ সুনানি ইবনি … Continue reading

২. আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
اتَّقُوا الْحَدِيثَ عَنِّي إِلا مَا عَلِمْتُمْ
“তোমরা আমার থেকে হাদীস বর্ণনা পরিহার করবে, শুধুমাত্র যা তোমরা জান তা ছাড়া।”[15]তিরমিযী, আস—সুনান ৫/১৮৩।

৩. আবু মূসা মালিক ইবনু উবাদাহ আল-গাফিকী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সর্বশেষ ওসীয়ত ও নির্দেশ প্রদান করে বলেন:
عَلَيْكُمْ بِكِتَابِ اللهِ، وَسَتَرْجِعُوْنَ إِلَى قَوْمٍ يُحِبُّونَ الْحَدِيْثَ عَنِّيْ- أَوْ كَلِمَةً تُشْبِهُهَا- فَمَنْ حَفِظَ شَيْئاً فَلْيُحَدِّثْ بِهِ، وَمَنْ قَالَ عَلَيَّ مَا لَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

“তোমরা আল্লাহর কিতাব সুদৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকবে ও অনুসরণ করবে। আর অচিরেই তোমরা এমন সম্প্রদায়ের নিকট গমন করবে যারা আমার নামে হাদীস বলতে ভালবাসবে। যদি কারো কোনো কিছু মুখস্থ থাকে তাহলে সে তা বলতে পারে।

আর যে ব্যক্তি আমার নামে এমন কিছু বলবে যা আমি বলিনি তাকে জাহান্নামে তার আবাসস্থল গ্রহণ করতে হবে।”[16]আহমদ ইবনু হাম্বাল (২৪১ হি), আল—মুসনাদ (কাইরো, মিশর, মুআসসাসাতু কুরতুবাহ, ও … Continue reading

এভাবে বিভিন্ন হাদীসে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মতকে তাঁর হাদীস হুবহু ও নির্ভুলভাবে মুখস্থ রাখতে ও এইরূপ মুখস্থ হাদীস প্রচার করতে নির্দেশ দিযেছেন। অপরদিকে পরিপূর্ণ মুখস্থ না থাকলে বা সামান্য দ্বিধা থাকলে সে হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেছেন।

কারণ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, তিনি যা বলেন নি সে কথা তাঁর নামে বলা নিষিদ্ধ ও কঠিনতম পাপ। ভুলক্রমেও যাতে তাঁর হাদীসের মধ্যে হেরফের না হয় এজন্য তিনি পরিপূর্ণ মুখস্থ ছাড়া হাদীস বলতে নিষেধ করেছেন। আমরা দেখতে পাব যে, সাহাবীগণ এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতেন।

৩. ২. ৪. মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীদের থেকে সতর্ক করা

নিজের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলা যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি অন্যের বানোনো মিথ্যা গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ। অন্যের বলা বা শেখানো কোনো হাদীসের যাচাই বাছায়ে ঢিলেমিও নিষিদ্ধ। কোনো হাদীসের নির্ভুলতার বিষয়ে সন্দেহ হলে তা হাদীস হিসাবে গ্রহণ করা বা প্রচার করাও নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্নভাবে মিথ্যা বা সন্দেহজনক হাদীস গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।

মুসলিম উম্মাহর ভিতরে মিথ্যাবাদী হাদীস বর্ণনাকারী ব্যক্তিবর্গের উদ্ভব হবে বলে তিনি উম্মাতকে সতর্ক করেছেন। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
سَيَكُونُ فِيْ آخِرِ الزَّمَانِ أُنَاسٌ مِنْ أُمَّتِيْ يُحَدِّثُونَكُمْ بِمَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ وَلاَ آبَاؤُكُمْ فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ
“শেষ যুগে আমার উম্মাতের কিছু মানুষ তোমাদেরকে এমন সব হাদীস বলবে যা তোমরা বা তোমাদের পিতা-পিতামহগণ কখনো শুননি। খবরদার! তোমরা তাদের থেকে সাবধান থাকবে, তাদের থেকে দুরে থাকবে।”[17] মুসলিম, আস—সহীহ ১/১২।

ওযাসিলাহ ইবনুর আসকা’ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لاَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَطُوْفَ إِبْلِيْسُ فِيْ الأَسْوَاقِ، يَقُوْلُ: حَدَّثَنِيْ فُلاَنُ بْنُ فُلاَنٍ بِكَذَا وَكَذَا
“কেয়ামতের পূর্বেই শয়তান বাজারে-সমাবেশে ঘুরে ঘুরে হাদীস বর্ণনা করে বলবে: আমাকে অমুকের ছেলে অমুক এই এই বিষয়ে এই হাদীস বলেছে।”[18]ইবনু আদী, আহমদ, আল—কামিল ফী দুআফাইর রিজাল (বৈরুত, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, … Continue reading

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা) বলেন,
إِنَّ الشَّيْطَانَ لِيَتَمَثَّلُ فِي صُورَةِ الرَّجُلِ فَيَأْتِي الْقَوْمَ فَيُحَدِّثُهُمْ بِالْحَدِيثِ مِنَ الْكَذِبِ فَيَتَفَرَّقُونَ فَيَقُولُ الرَّجُلُ مِنْهُمْ سَمِعْتُ رَجُلا أَعْرِفُ وَجْهَهُ وَلا أَدْرِي مَا اسْمُهُ يُحَدِّثُ
“শয়তান মানুষের রূপ ধারণ করে মানুষদের মধ্যে আগমন করে এবং তাদেরকে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করে। এরপর মিথ্যা হাদীসগুলি শুনে সমবেত মানুষ সমাবেশ ভেঙ্গে চলে যায়। অতঃপর তারা সেসকল মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করে বলে: আমি একব্যক্তিকে হাদীসটি বলতে শুনেছি যার চেহারা আমি চিনি তবে তার নাম জানি না।”[19]মুসলিম, আস—সহীহ ১/১২।

৩. ২. ৫. সন্দেহযুক্ত বা অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাচাই না করে কোনো হাদীস গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। যদি কেউ যাচাই না করে যা শুনে তাই হাদীস বলে গ্রহণ করে ও বর্ণনা করে তাহলে হাদীস যাচাইয়ে তার অবহেলার জন্য সে হাদীসের নামে মিথ্যা বলার পাপে পাপী হবে।

ইচ্ছাকৃত মিথ্যা হাদীস বানানোর জন্য নয়, শুধুমাত্র সত্যমিথ্যা যাচাই না করে হাদীস গ্রহণ করাই তার মিথ্যাবাদী বানানোর জন্য যথেষ্ট বলে হাদীসে বলা হয়েছে। উপরন্তু, যদি কোনো হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নিভুলতা সম্পর্কে দ্বিধা বা সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তি সেই হাদীস বর্ণনা করে তাহলে সেও মিথ্যাবাদী বলে গণ্য হবে ও মিথ্য হাদীস বলার পাপে পাপী হবে।

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ.
“একজন মানুষের পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই বর্ণনা করবে।”[20]মুসলিম, আস—সহীহ ১/১০।
সামুরাহ ইবনু জুনদুব (রা) ও মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ حَدَّثَ عَنِّيْ حَدِيْثًا وَهُوَ يُرَى أَنَّهُ كَذِبٌ فَهُوَ أَحَدُ الْكَاذِبَيْنِ.
“যে ব্যক্তি আমার নামে কোনো হাদীস বলবে এবং তার মনে সন্দেহ হবে যে, হাদীসটি মিথ্যা, সেও একজন মিথ্যাবাদী।”[21]মুসলিম, আস—সহীহ ১/৯।

৪. হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতা রক্ষায় সাহাবীগণের কর্মপদ্ধতি

ওহীর জ্ঞানের নির্ভুল ও অবিমিশ্র সংরক্ষণের বিষয়ে কুরআন ও হাদীসের সামগ্রিক নির্দেশ, হাদীসের নির্ভুল ও অবিমিশ্র সংরক্ষণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ নির্দেশের আলোকে সাহাবীগণ হাদীসের নির্ভুল ও নির্ভেজাল সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তাঁরা একদিকে নিজেরা হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতেন।

পরিপূর্ণ ও নির্ভুল মুখস্থ সম্পর্কে পূর্ণ নিশ্চিত না হলে তাঁরা হাদীস বলতেন না। অপরদিকে তাঁরা সবাইকে এভাবে পূর্ণরূপে হুবহু ও নির্ভুলভাবে মুখস্থ করে হাদীস বর্ণনা করতে উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান করতেন। তৃতীয়ত, তাঁরা সাহাবী ও তাবিয়ী যে কোনো হাদীস বর্ণনাকারীর হাদীসের নির্ভুলতার বিষয়ে সামান্যতম দ্বিধা হলে তা বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করার পরে গ্রহণ করতেন। এখানে আমরা তাঁদের এ সকল পদ্ধতি আলোচনা করব।

৪. ১. হাদীস বর্ণনায় আক্ষরিকভাবে নির্ভুল বলার সর্বাত্মক চেষ্টা

সাহাীগণ নিজে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে ও আক্ষরিকভাবে হাদীস বলার সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন এবং অন্যের বর্ণিত হাদীস গ্রহণ করার ক্ষেত্রে নির্ভুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর তা গ্রহণ করতেন। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁদের সতর্কতার অগণিত ঘটনা হাদীস গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি।

তাবিয়ী আম্র ইবনু মাইমূন আল-আযদী (৭৪ হি) বলেন,
مَا أَخْطَأَنِي ابْنُ مَسْعُودٍ عَشِيَّةَ خَمِيسٍ إِلا أَتَيْتُهُ فِيهِ، قَالَ فَمَا سَمِعْتُهُ يَقُولُ بِشَيْءٍ قَطُّ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ. فَلَمَّا كَانَ ذَاتَ عَشِيَّةٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَنَكَسَ، قَالَ: فَنَظَرْتُ إِلَيْهِ فَهُوَ قَائِمٌ مُحَلَّلَةً أَزْرَارُ قَمِيصِهِ قَدِ اغْرَوْرَقَتْ عَيْنَاهُ وَانْتَفَخَتْ أَوْدَاجُهُ، قَالَ: أَوْ دُونَ ذَلِكَ أَوْ فَوْقَ ذَلِكَ أَوْ قَرِيبًا مِنْ ذَلِكَ أَوْ شَبِيهًا بِذَلِكَ.

আমি প্রতি বৃহস্পতিবার বিকালে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা) এর নিকট আগমন করতাম। তিনি তাঁর কথাবার্তার মধ্যে ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন’ একথা কখনো বলতেন না।

এক বিকালে তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন’, এরপর তিনি মাথা নিচু করে ফেলেন। আমি তাঁর দিকে তাঁকিয়ে দেখি, তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর জামার বোতামগুলি খোলা। তাঁর চোখ দুটি লাল হয়ে গিয়েছে এবং গলার শিরাগুলি ফুলে উঠেছে।

তিনি বললেন: অথবা এর নিচে, অথবা এর উপরে, অথবা এর মত, অথবা এর কাছাকাছি কথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন।[22]ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১০—১১; দারিমী, আস—সুনান ১/৮৮; আহমদ, আল—মুসনাদ ১/ ৪৫২; … Continue reading

তাবিয়ী মাসরূক ইবনুল আজদা’ আবু আইশা (৬১ হি) বলেন,
إن عبد الله حَدَّثَ يَوْماً عَنْ رَسُولِ اللهِ فَارْتَعَدَ وَارْتَعَدَتْ ثِيَابُهُ، ثُمَّ قَالَ: أَوْ نَحْوَ هَذَا
একদিন আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তখন তিনি কেঁপে উঠেন এমনকি তাঁর পোশাকেও কম্পন পরিলক্ষিত হয়। এরপর তিনি বলেন: অথবা অনুরূপ কথা তিনি বলেছেন।[23]হাকিম, আল—মুসতাদরাক ১/১৯৩।

তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন (১১০ হি) বলেন:

كَانَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ إِذَا حَدَّثَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَدِيثًا فَفَرَغَ مِنْهُ قَالَ أَوْ كَمَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

আনাস ইবনু মালিক (রা) যখন হাদীস বলতেন তখন হাদীস বর্ণনা শেষ করে বলতেন: অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছেন (আমার বর্ণনায় ভুল হতে পারে)।”[24]ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১১।

হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সাহাবীগণ জ্ঞাতসারে একটি শব্দেরও পরিবর্তন করতেন না। আক্ষরিকভাবে হুবহু বর্ণনা করতেন তাঁরা। তাবিয়ী সা’দ ইবনু উবাইদাহ সুলামী (১০৩ হি) বলেন: সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (৭৩ হি) বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

بني الإسلام على خمسة على أن يوحد الله وإقام الصلاة وإيتاء الزكاة وصيام رمضان والحج فقال رجل الحج وصيام رمضان قال لا صيام رمضان والحج هكذا سمعته من رسول الله صلى الله عليه وسلم

“পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত বা তাওহীদ, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত প্রদান করা, রামাদানের সিয়াম পালন এবং হজ্জ।” তখন একব্যক্তি বলে: “হজ্জ ও রামাদানের সিয়াম”। তিনি বলেন: না, “রামাদানের সিয়াম ও হজ্জ।” এভাবেই আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি।[25]মুসলিম, আস—সহীহ ১/৪৫।

ইয়াফুর ইবনু রূযী নামক তাবিয়ী বলেন, আমি শুনলাম, উবাইদ ইবনু উমাইর (৭২ হি) নামক প্রখ্যাত তাবিয়ী ও মক্কার সুপ্রসিদ্ধ ওয়ায়িজ একদিন ওয়াজের মধ্যে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مثل المنافق كمثل الشاة الرابضة بين الغنمين
“মুনাফিকের উদাহরণ হলো দুইটি ছাগলের পালের মধ্যে অবস্থানরত বা বিশ্রামরত ছাগলের ন্যায়।” একথা শুনে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (৭৩ হি) বলেন:

ويلكم لا تكذبوا على رسول الله ر. إنما قال رسول الله ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ: مثل المنافق كمثل الشاة العائرة بن الغنمين

“দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেন: “মুনাফিকের উদাহরণ হলো দুইটি ছাগলের পালের মধ্যে যাতায়াতকারী (wandering, roaming) ছাগলের ন্যায়।”[26]আহমদ, আল—মুসনাদ ২/৮৮; মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬১ হি) কিতাবুত তাময়ীয (রিয়াদ, … Continue reading

হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা ও পরিপূর্ণ নির্ভুলতা নিশ্চিত করার জন্য অধিকাংশ সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে হাদীস বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকতেন। শুধুমাত্র যে কথাগুলি বা ঘটনাগুলি তাঁরা পরিপূর্ণ নির্ভুলভাবে মুখস্থ রেখেছেন বলে নিশ্চিত থাকতেন সেগুলিই বলতেন।

অনেকে কখনোই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে কিছু বলতেন না। সাহাবীগণের সংখ্যা ও হাদীস-বর্ণনাকারী সাহাবীগণের সংখ্যার মধ্যে তুলনা করলেই আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কমবেশি সাহচার্য লাভ করেছেন এমন সাহাবীর সংখ্যা লক্ষাধিক। নাম পরিচয় সহ প্রসিদ্ধ সাহাবীর সংখ্যা ১০ সহস্রাধিক। অথচ হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা মাত্র দেড় হাজার।

সাহাবীদের নামের ভিত্তিতে সংকলিত প্রসিদ্ধ সর্ববৃহৎ হাদীস গ্রন্থ মুসনাদ আহমদ। এতে মোটামুটি গ্রহণ করার মত সকল সহীহ ও যয়ীফ হাদীস সংকলিত করেছেন ইমাম আহমদ। এতে ৯০৪ জন সাহাবীর হাদীস সংকলিত হয়েছে। পরিচিত, অপরিচিত, নির্ভরযোগ্য, অনির্ভরযোগ্য সকল হাদীসের বর্ণনাকারী সাহাবীর সংখ্যা একত্রিত করলে ১৫৬৫ হয়।

এখানে আরো লক্ষণীয় যে, হাদীস বর্ণনাকারী সহস্রাধিক সাহাবীর মধ্যে অধিকাংশ সাহাবী মাত্র ১ টি থেকে ২০/৩০ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ১০০ টির অধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন এমন সাহাবীর সংখ্যা মাত্র ৩৮ জন।

এঁদের মধ্যে মাত্র ৭ জন সাহাবী থেকে ১০০০ (এক হাজারের) অধিক হাদীস বর্ণিহয়েছে। বাকী ৩১ জন সাহাবী থেকে একশত থেকে কয়েকশত হাদীস বর্ণিত হয়েছে।[27]বিস্তারিত দেখুন: ইবনু হাযম, আলী ইবনু আহমদ (৪৫৬ হি), আসমাউস সাহাবাহ আর—রুআত … Continue reading)
অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকার অনেক বিবৃতি সাহাবীগণ থেকে বর্ণিত হয়েছে।

সাইব ইবনু ইয়াযিদ (৯১ হি) একজন সাহাবী ছিলেন। ছোট বয়সে তিনি বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচার্য লাভ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি সাহাবীগণের সাহচার্যে জীবন কাটিয়েছেন। তিনি বলেন,

صحبت عبد الرحمن بن عوف، وطلحة بن عبيد الله، وسعد بن أبي وقاص، والمقداد بن الأسود، فلم أسمع أحداً منهم يتحدث عن رسول الله ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ، إلا أني سمعت طلحة بن عبيد الله يتحدث عن يوم أحد

আমি আব্দুর রাহমান ইবনু আউফ (রা), তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ (রা), সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রা), মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা) প্রমূখ সাহাবীর সাহচার্যে সময় কাটিয়েছি। তাঁদের কাউকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বলতে শুনিনি।

তবে শুধুমাত্র তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহকে আমি উহদ যুদ্ধ সম্পর্কে বলতে শুনেছি।[28]ইবনু আদী, আব্দুল­াহ জুরজানী (৩৬৫ হি) আল—কামিল ফী দুআফাইর রিজাল, (বৈরুত, দারুল … Continue reading

তিনি আরো বলেন:

صَحِبْتُ سَعْدَ بْنَ مَالِكٍ مِنَ الْمَدِينَةِ إِلَى مَكَّةَ فَمَا سَمِعْتُهُ يُحَدِّثُ عَنِ النَّبِيِّ ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ بِحَدِيثٍ وَاحِدٍ

আমি সা’দ ইবনু মালিক (রা) এর সাহচার্যে মদীনা থেকে মক্কা পর্যন্ত থাকি। এই দীর্ঘ পথে দীর্ঘ সময়ে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে একটি হাদীসও বলতে শুনিনি।[29]ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১২; আলবানী, সহীহ সুনানি ইবনি মাজাহ ১/২৮।

হিজরী প্রথম শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী আমির ইবনু শারাহীল শা’বী (২০৪ হি) বলেন:

جَالَسْتُ ابْنَ عُمَرَ سَنَةً فَمَا سَمِعْتُهُ يُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ شَيْئًا

আমি আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের (রা) সাথে পূরো একটি বৎসর থেকেছি, অথচ তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কিছুই বলতে শুনিনি।[30]ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১১, আলবানী, সহীহ সুনানি ইবনি মাজাহ ১/২৬।

অন্যত্র তিনি বলেন:

قَاعَدْتُ ابْنَ عُمَرَ قَرِيبًا مِنْ سَنَتَيْنِ أَوْ سَنَةٍ وَنِصْفٍ فَلَمْ أَسْمَعْهُ يُحَدِّثُ عَنِ النَّبِيِّ ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ غَيْرَ هَذَا (حديثاً واحداً)

আমি দুই বৎসর বা দেড় বৎসর আব্দুল্লাহ ইবনু উমারের (রা) কাছে বসেছি। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁকে মাত্র একটি হাদীস বলতে শুনেছি…।[31]বুখারী, আস—সহীহ ৬/২৬৫২; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১৩/২৪৩।

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর (রা) বলেন, আমি আমার পিতা যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা) কে বললাম, অন্যান্য কোনো কোনো সাহাবী যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেন আপনাকে তদ্রƒপ হাদীস বলতে শুনিনা কেন? তিনি বলেন:
أَمَا إِنِّي لَمْ أُفَارِقْهُ وَلَكِنْ سَمِعْتُهُ يَقُولُ مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
“শুনে রাখ, ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আমি কখনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচার্য থেকে দূরে যাই নি। কিন্তু আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, আমার নামে যে ব্যক্তি মিথ্যা বলবে তাকে অবশ্যই জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।”[32]বুখারী, আস—সহীহ ১/৫২; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১/২০০।

তাহলে যুবাইর ইবনুল আওয়াম (৩৬ হি) -এর হাদীস না বলার কারণ অজ্ঞতা নয়। তিনি নবুয়তের প্রথম পর্যায়ে কিশোর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এরপর দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচার্যে জীবন কাটিয়েছেন।

তাঁর ইন্তেকালের পরে তিনি প্রায় ১৫ বৎসর বেঁচে ছিলেন। অথচ তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৪০ টিরও কম। মুসনাদ আহমদে তাঁর থেকে ৩৬ টি হাদীস সংকলিত হয়েছে। ইবনু হাযাম উল্লেখ করেছেন যে, নির্ভরযোগ্য ও অনির্ভরযোগ্য সনদে তাঁর নামে বর্ণিত সকল হাদীসের সংখ্যা মাত্র ৩৮ টি।[33]ইবনু হাযাম, আসমাউস সাহাবাহ আর—রুআত, পৃ: ৯৫।

আমরা দেখছি যে, অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে তিনি হাদীস বলা থেকে বিরত থাকতেন। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলার শাস্তি জাহান্নাম। আর অনিচ্ছাকৃত ভুল বা শব্দগত পরিবর্তন ও তাঁর নামে মিথ্যা বলা হতে পারে। এজন্য তিনি হাদীস বর্ণনা থেকে অধিকাংশ সময় বিরত থাকতেন।

অন্যান্য সাহাবীও এভাবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। তাবিয়ী আব্দুর রাহমান ইবনু আবী লাইলা (৮৩ হি) বলেন,

قُلْنَا لِزَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ: حَدِّثْنَا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ قَالَ كَبِرْنَا وَنَسِينَا وَالْحَدِيثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ شَدِيدٌ.

আমরা সাহাবী যাইদ ইবনু আরকাম (৬৮ হি) কে বললাম, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করুন। তিনি বলেন: আমরা বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছি এবং বিস্মৃতি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে হাদীস বলা খুবই কঠিন দায়িত্ব।[34]ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১১।

সাহাবী সুহাইব ইবনু সিনান (রা) বলতেন:

هلموا أحدثكم من مغازينا، فأما أن أقول: قال رسول الله ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ، فلا

তোমরা এস, আমি তোমাদেরকে আমাদের যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনী বর্ণনা করব। তবে কোনো অবস্থাতেই আমি ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন’ একথা বলব না।[35]বালাযুরী আহমদ ইবনু ইয়াহইয়া (২৭৯ হি), আনসাবুল আশরাফ (কাইরো, মুহাম্মাদ … Continue reading

তাবিয়ী হাশিম হুরমুযী বলেন, আনাস ইবনু মালিক (রা) বলতেন:
لَوْلا أَنْ أَخْشَى أَنْ أُخْطِئَ لَحَدَّثْتُكُمْ بِأَشْيَاءَ سَمِعْتُهَا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، لَكِنَّهُ قَالَ مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
আমার ভয হয় যে, আমি অনিচ্ছাকৃত ভুল করে ফেলব। এই ভয় না থাকলে আমি অনেক কিছু তোমাদেরকে বলতাম যা আমি তাঁকে বলতে শুনেছি। কিন্তু তিনি বলেছেন: যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার নামে মিথ্যা বলবে তাকে জাহান্নামে বসবাস করতেই হবে।[36]আহমদ, আল—মুসনাদ ৩/১৭২।

তাবিয়ী আব্দুর রাহমান ইবনু কা’ব ইবনু মালিক (৯৮ হি) বলেন: আমি আবু কাতাদাহ (রা) কে বললাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে যা শুনেছেন সেসব হাদীস থেকে কিছু আমাকে বলুন। তিনি বলেন:

إني أَخْشَى أَنْ يَزِلَّ لِسَانِي بِشَيْءٍ لَمْ يَقُلْهُ رَسُوْلُ اللهِ ِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّ، إِنِّيْ سَمِعْتُهُ يَقُوْلُ: إِيَّاكُمْ وَكَثْرَةَ الْحَدِيْثِ عَنِّي، مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّداً فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

আমার ভয় হয় যে, আমার জিহ্বা পিছলে এমন কিছু বলবে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন নি। আর আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, সাবধান, তোমরা আমার নামে বেশি হাদীস বলা পরিহার করবে। যে ব্যক্তি আমার নামে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলবে তাকে অবশ্যই জাহান্নামে বসবাস করতে হবে।[37]হাকিম, আল—মুসতাদরাক ১/১৯৫।

এভাবে সাহাবীগণ অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা থেকে বিরত থাকতেন। এখানে লক্ষণীয় যে, আনাস ইবনু মালিক ও আবু কাতাদাহ দুজনেই বলছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর নামে মিথ্যা বলার শাস্তি বর্ণনা করেছেন।’ কিন্তু তাঁরা অনিচ্ছাকৃত ভুলের ভয়ে হাদীস বর্ণনা পরিহার করছেন।

কারণ ভুল হতে পারে জেনেও সাবধান না হওয়ার অর্থ ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের সুযোগ দেওয়া।’ অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে সর্বাত্মক সতর্ক না হওয়ার অর্থ ইচ্ছাকৃত বিকৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া। কাজেই যে ব্যক্তি অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে সতর্ক না হওয়ার কারণে ভুল করলো, সে ইচ্ছাকৃতভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা বলল। কোনো মুমিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসের বিষয়ে অসতর্ক হতে পারেন না।

৪. ২. হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা যাচইয়ের জন্য তুলনামূলক নিরীক্ষা

এভাবে আমরা দেখছি যে, সাহাবীগণ নিজেরা হাদীস বর্ণনার সময় আক্ষরিকভাবে নির্ভুল বলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতেন এবং কোনো প্রকারের দ্বিধা বা সন্দেহ হলে হাদীস বলতেন না। হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় তাঁদের দ্বিতীয় কর্মধারা ছিল অন্যের বর্ণিত হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনুরূপ সতর্কতা অবলম্বন করা। অন্য কোনো সাহাবী বা তাঁদের সমকালীন তাবিয়ীর বর্ণিত হাদীসের আক্ষরিক নির্ভুলতা বা যথার্থতা (Accuracy) সম্বন্ধে সামান্যতম সন্দেহ হলে তাঁরা তা যাচাই না করে গ্রহণ করতেন না। এ

ই সুক্ষ্ম যাচাই ও নিরীক্ষাকে তাঁরা হাদীসের বিশুদ্ধতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করতেন। এজন্য এতে কেউ কখনো আপত্তি করেন নি বা অসম্মান বোধ করেন নি।

৪. ২. ১. বর্ণনার নির্ভুলতা ও যথার্থতা নির্ণয়ে তুলনামূলক নিরীক্ষা

আমরা বুঝতে পারি যে, হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুল করার দুইটি পর্যায় থাকতে পারে : ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত। উভয় ধরনের ভুল ও দুর্বলতার বিরুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

তাঁদের যুগে কোনো সাহাবী মিথ্যা বলতেন না এবং নির্ভুলভাবে হাদীস বলার চেষ্টায় কোনো ত্র“টি করতেন না। তবুও তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীর কোনো ভুল হতে পারে সন্দেহ হলেই তাঁর বর্ণনাকে তুলনামূলক নিরীক্ষার (معارضة ومقابلة وموازنة) মাধ্যমে যাচাই করে তা গ্রহণ করতেন। তুলনামূলক নিরীক্ষার প্রক্রিয়া ছিল বিভিন্ন ধরনের:

১. বর্ণিত হাদীস অর্থাৎ বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনাকে মূল নির্দেশদাতার নিকট পেশ করে তার যথার্থতা ও নির্ভুলতা (অপপঁৎধপু) নির্ণয় করা।
২. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনা (হাদীস)-কে অন্য কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তির বর্ণনার সাথে মিলিয়ে তার যথার্থতা ও নির্ভুলতা নির্ণয় করা।
৩. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা বর্ণনা (হাদীস) -কে বর্ণনাকারীর বিভিন্ন সময়ের বর্ণনার সাথে মিলিয়ে তার যথার্থতা ও নির্ভুলতা নির্ণয় করা।
৪. বর্ণিত হাদীস বিষয়ে বর্ণনাকারীকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে বা শপথ করিয়ে বর্ণনাটির যথার্থতা বা নির্ভুলতা নির্ধারণ করা।
৫. বর্ণিত বাণী, নির্দেশ বা হাদীসটির অর্থ কুরআন ও হাদীসের প্রসিদ্ধ অর্থ ও নির্দেশের সাথে মিলিয়ে দেখা।

এ সকল নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারী হাদীসটি সঠিকভাবে মুখস্থ রাখতে ও বর্ণনা করতে পেরেছে কিনা তা যাচাই করতেন। হাদীসের পরিভাষায় একে ‘ضبط’ বলা হয়। বাংলায় আমরা একে ‘বর্ণনার নির্ভুলতা’ বা ‘নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা’ বলতে পারি।

সাহাবীগণের যুগ থেকে পরবর্তী সকল যুগে হাদীসের ‘বর্ণনার নির্ভুলতা’ ও বিশুদ্ধতা নির্ধারণে এ সকল পদ্ধতিতে নিরীক্ষাই ছিল মুহাদ্দিসগণের মুল পদ্ধতি। আমরা জানি যে, বিশ্বের সকল দেশের সকল বিচারালয়ে প্রদত্ত সাক্ষ্যের যর্থার্থতা ও নির্ভুলতা নির্ণয়ের জন্যও এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। কোনো বর্ণনা বা সাক্ষ্যের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতা নির্ণয়ের জন্য এটিই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। আমরা এখানে সাহাবীগণের যুগের কিছু উদাহরণ আলোচনা করব।

৪. ২. ২. বর্ণিত বক্তব্য মুল বক্তব্যদাতার নিকট পেশ করা

কোনো সাক্ষ্য বা বর্ণনার যর্থার্থতা যাচাইয়ের সর্বোত্তম উপায় বক্তব্যদাতার নিকট প্রশ্ন করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় কোনো সাহাবী অন্য কেনো সাহাবীর বর্ণিত হাদীসের নির্ভুলতার বিষয়ে সন্দীহান হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করে নির্ভুলতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। বিভিন্ন হাদীসে এ বিষয়ক অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এখানে দুই তিনটি ঘটনা উল্লেখ করছি।

১. জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রা) বিদায় হজ্জের বর্ণনার মধ্যে বলেন:

وَقَدِمَ عَلِيٌّ مِنَ الْيَمَنِ … فَوَجَدَ فَاطِمَةَ رَضِي اللَّه عَنْهَا مِمَّنْ حَلَّ وَلَبِسَتْ ثِيَابًا صَبِيغًا وَاكْتَحَلَتْ فَأَنْكَرَ ذَلِكَ عَلَيْهَا فَقَالَتْ إِنَّ أَبِي أَمَرَنِي بِهَذَا قَالَ فَكَانَ عَلِيٌّ يَقُولُ بِالْعِرَاقِ فَذَهَبْتُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مُحَرِّشًا عَلَى فَاطِمَةَ لِلَّذِي صَنَعَتْ مُسْتَفْتِيًا لِرَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِيمَا ذَكَرَتْ عَنْهُ فَأَخْبَرْتُهُ أَنِّي أَنْكَرْتُ ذَلِكَ عَلَيْهَا فَقَالَ صَدَقَتْ صَدَقَتْ”.

(বিদায় হজ্জের পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী (রা) কে ইয়ামানের প্রশাসক হিসাবে প্রেরণ করেন। ফলে) আলী (রা) ইয়ামান থেকে মক্কায় হজ্জে আগমন করেন। তিনি মক্কায় এসে দেখেন যে, ফাতিমা (রা) উমরা পালন করে ‘হালাল’ হয়ে গিয়েছেন।

তিনি রঙিন সুগন্ধময় কাপড় পরিধান করেছেন এবং সুরমা ব্যবহার করেছেন। আলী এতে আপত্তি করলে তিনি বলেন: আমার আব্বা আমাকে এভাবে করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আলী বলেন: আমি ফাতিমার বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ করলাম, সে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের কথা বলেছে তাও বললাম এবং আমার আপত্তির কথাও বললাম।… তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সে ঠিকই বলেছে, সে সত্যই বলেছে।”[38]মুসলিম, আস—সহীহ ২/৮৮৬—৮৯২।

এখানে আমরা দেখতে পাই যে, আলী (রা) ফাতেমার (রা) বর্ণনার যথার্থতার বিষয়ে সন্দীহান হন। তিনি তাঁর সত্যবাদীতায় সন্দেহ করেন নি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝা ও বর্ণনা করার বিষয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। এজন্য তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করে নির্ভুলতা যাচাই করেন।

২. উবাই ইবনু কা’ব বলেন,

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَرَأَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ تَبَارَكَ وَهُوَ قَائِمٌ فَذَكَّرَنَا بِأَيَّامِ اللَّهِ وَأَبُو الدَّرْدَاءِ أَوْ أَبُو ذَرٍّ يَغْمِزُنِي، فَقَالَ: مَتَى أُنْزِلَتْ هَذِهِ السُّورَةُ؟ إِنِّي لَمْ أَسْمَعْهَا إِلا الْآنَ. فَأَشَارَ إِلَيْهِ أَنِ اسْكُتْ. فَلَمَّا انْصَرَفُوا قَالَ: سَأَلْتُكَ مَتَى أُنْزِلَتْ هَذِهِ السُّورَةُ فَلَمْ تُخْبِرْنِي؟ فَقَالَ أُبَيٌّ: لَيْسَ لَكَ مِنْ صَلاتِكَ الْيَوْمَ إِلا مَا لَغَوْتَ. فَذَهَبَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ وَأَخْبَرَهُ بِالَّذِي قَالَ أُبَيٌّ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم: “صَدَقَ أُبَيٌّ”.

একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমু‘আর দিনে খুতবায় দাঁড়িয়ে সূরা তাবারাকা (সূরা ২৫- আল-ফুরকান) পাঠ করেন এবং আমাদেরকে আল্লাহর নেয়ামত ও শান্তি সম্পর্কে ওয়ায করেন। এমতাবস্থায় আবু দারদা বা আবু যার আমার দেহে মৃদু চাপ দিয়ে বলেন: এই সূরা কবে নাযিল হলো, আমি তো এখনই প্রথম সূরাটি শুনছি। তখন উবাই তাকে ইশারায় চুপ করতে বলেন।

সালাত শেষ হলে তিনি (আবু যার বা আবু দারদা) বলেন: আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, সূরাটি কখন নাযিল হয়েছে, অথচ আপনি আমাকে কিছুই বললেন না! তখন উবাই বলেন: আপনি আজ আপনার সালাতের কোনোই সাওয়াব লাভ করেন নি, শুধুমাত্র যে কথাটুকু বলেছেন সেটুকুই আপনার (কারণ খুতবার সময়ে কথা বললে সালাতের সাওয়াব নষ্ট হয়।)

তখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট যেয়ে বিষয়টি বলেন: তিনি বলেন: “উবাই সত্য বলেছে।”[39]ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/৩৫২—৩৫৩; বুসীরী, আহমদ ইবনু আবী বাকর (৮৪০হি), যাওয়াইদ … Continue reading

৩. আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস (রা) বলেন:
حدثت أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال صلاة الرجل قاعدا نصف الصلاة قال فأتيته فوجدته يصلي جالسا فوضعت يدي على رأسه فقال مالك يا عبد الله بن عمرو قلت حدثت يا رسول الله أنك قلت صلاة الرجل قاعدا على نصف الصلاة وأنت تصلي قاعدا قال أجل ولكني لست كأحد منكم

“আমাকে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কোনো ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করলে তা অর্ধেক সালাত হবে। তখন আমি তাঁর নিকট গমন করলাম। আমি দেখলাম যে, তিনি বসে সালাত আদায় করছেন। তখন আমি তাঁর মাথার উপর আমার হাত রাখলাম।

তিনি বললেন: হে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর, তোমার বিষয় কি? আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে বলা হয়েছে যে, আপনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তি বসে সালাত আদায় করলে তা অর্ধ-সালাত হবে, আর আপনি বসে সালাত আদায় করছেন। তিনি বললেন: হ্যাঁ, (আমি তা বলেছি), তবে আমি তোমাদের মত নই।”[40]মুসলিম, আস—সহীহ ১/৫০৭।

এভাবে অনেক ঘটনায় আমরা হাদীসে দেখতে পাই যে, কারো বর্ণিত হাদীসের যথার্থতা বা নির্ভুলতার বিষয়ে সন্দেহ হলে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করে যথার্থতা যাচাই করতেন। তাঁরা বর্ণনাকারীর সততার বিষয়ে প্রশ্ন তুলতেন না। মুলত তিনি বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝেছেন কিনা এবং নির্ভুলভাবে বর্ণনা করেছেন কিনা তা তাঁরা যাচাই করতেন।

৪. ২. ৩. বর্ণিত বক্তব্যের যর্থার্থতা যাচায়ের জন্য অন্যদেরকে প্রশ্ন করা

সাক্ষ্য বা বক্ত্যব্যের যথার্থতা নির্ণয়ের জন্য দ্বিতীয় পদ্ধতি বক্তব্যটি অন্য কেউ শুনেছেন কিনা এবং কিভাবে শুনেছেন তা খোজ করা। যে কোনো সাক্ষ্য বা বক্ত্যবের নির্ভুলতা নির্ণয়ের জন্য তা সর্বজনীন পদ্ধতি। সকল বিচারালয়ে বিচারপতিগণ একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যের তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমেই রায় প্রদান করেন। একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যের মিল বিষয়টির সত্যতা প্রমাণিত করে এবং অমিল প্রামাণ্যতা নষ্ট করে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে সাহাবীগণ এই পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। কোনো সাহাবীর বর্ণিত কোনো হাদীসের যথার্থতা বা নির্ভুলতা বিষয়ে তাঁদের কারো দ্বিধা হলে তাঁরা অন্যান্য সাহাবীকে প্রশ্ন করতেন বা বর্ণনাকারীকে সাক্ষী আনতে বলতেন।

যখন এক বা একাধিক ব্যক্তি বলতেন যে, তাঁরাও ঐ হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে শুনেছেন, তখন তাঁরা হাদীসটি গ্রহণ করতেন। আবু বাকর সিদ্দীক (রা) এই পদ্ধতির শুরু করেন। পরবর্তী খলীফাগণ ও সকল যুগের মুহাদ্দিসগণ তা অনুসরণ করেন।

এখানে সাহাবীগণের যুগের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি।

১. সাহাবী কাবীসাহ ইবনু যুআইব (৮৪ হি) বলেন:

جَاءَتِ الْجَدَّةُ إِلَى أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ تَسْأَلُهُ مِيرَاثَهَا فَقَالَ لَهَا أَبُو بَكْرٍ مَا لَكِ فِي كِتَابِ اللَّهِ شَيْءٌ وَمَا عَلِمْتُ لَكِ فِي سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وصلم شَيْئًا فَارْجِعِي حَتَّى أَسْأَلَ النَّاسَ، فَسَأَلَ النَّاسَ فَقَالَ الْمُغِيرَةُ بْنُ شُعْبَةَ: حَضَرْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وصلم أَعْطَاهَا السُّدُسَ. فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ: هَلْ مَعَكَ غَيْرُكَ؟ فَقَامَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ الأَنْصَارِيُّ فَقَالَ مِثْلَ مَا قَالَ الْمُغِيرَةُ، فَأَنْفَذَهُ لَهَا أَبُو بَكْرٍ الصِّدِّيقُ.

“এক দাদী আবু বাকর (রা) এর নিকট এসে মৃত পৌত্রের সম্পত্তিতে তার উত্তরাধিকার দাবী করেন। আবু বাকর (রা) তাকে বলেন: আল্লাহর কিতাবে আপনার জন্য (দাদীর উত্তরাধিকার বিষয়ে) কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতেও আমি আপনার জন্য কিছু আছে বলে জানি না। আপনি পরে আসবেন, যেন আমি এ বিষয়ে অন্যান্য মানুষকে প্রশ্ন করে জানতে পারি।

তিনি এ বিষয়ে মানুষদের প্রশ্ন করেন। তখন সাহাবী মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা) বলেন: আমার উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাদীকে এক-ষষ্ঠাংশ (পরিত্যক্ত সম্পত্তির ৬ ভাগের একভাগ) প্রদান করেন।

তখন আবু বাকর (রা) বলেন: আপনার সাথে কি অন্য কেউ আছেন? তখন অন্য সাহাবী মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ আনসারী (রা) উঠে দাঁড়ান এবং মুগীরার অনুরূপ কথা বলেন। তখন আবু বাকর সিদ্দীক (রা) দাদীর জন্য ১/৬ অংশ প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন।”[41]মালিক ইবনু আনাস (১৭৯ হি), আল—মুআত্তা (কাইরো, দারু এহইয়ায়িত তুরাস আল—আরাবী, … Continue reading

এখানে আমরা দেখছি যে, আবু বাকর সিদ্দীক (রা) হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা শিক্ষা দিলেন। মুগীরাহ ইবনু শু’বার একার বর্ণনার উপরেই তিনি নির্ভর করতে পারতেন। কারণ তিনি প্রসিদ্ধ সাহাবী এবং কুরাইশ বংশের অত্যন্ত সম্মানিত নেতা ছিলেন।

সমাজের যে কোনো পর্যায়ে তাঁর একার সাক্ষ্যই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু তা সত্ত্বেও আবু বাকর (রা) সাবধানতা অবলম্বন করলেন। মুগীরাহর (রা) বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত হলেও তাঁর স্মৃতি বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারে বা তাঁর অনুধাবনে ভুল হতে পারে। এজন্য তিনি দ্বিতীয় আর কেউ হাদীসটি জানেন কিনা তা প্রশ্ন করেন। দুই জনের বিবরণের উপর নির্ভর করে তিনি হাদীসটি গ্রহণ করেন।

এজন্য মুহাদ্দিসগণ আবু বাকর সিদ্দীক (রা) কে হাদীস সমালোচনার জনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লামা হাকিম নাইসাপূরী (৪০৫ হি) তাঁর সম্পর্কে বলেন:

أول من وقى الكذب عن رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

“তিনিই সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।”[42]মুহাম্মাদ মুস্তাফা আল—আযামী, মানহাজুন নাকদ ইনদাল মুহাদ্দিসীন (রিয়াদ, … Continue reading

আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনু তাহির ইবনুল কাইসুরানী (৫০৭ হি) সিদ্দীকে আকবারের জীবনী আলোচনা কালে বলেন:
وهو أول من احتاط في قبول الأخبار.
“তিনিই সর্বপ্রথম হাদীস গ্রহণ করার বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করেন।”[43]মুহাম্মাদ ইবনু তাহির ইবনুল কাইসুরানী (৫০৭হি), তাযকিরাতুল হুফফায (রিয়াদ, … Continue reading

২. দ্বিতীয় খলীফ উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এ বিষয়ে তাঁর পূর্বসূরী সিদ্দীকে আকবারের অনুসরণ করেছেন। বিভিন্ন ঘটনায় তিনি সাহাবীগণকে বর্ণিত হাদীসের জন্য দ্বিতীয় কোনো সাহাবীকে সাক্ষী হিসাবে আনয়ন করতে বলতেন। এই জাতীয় দুই একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন:

كُنْتُ فِي مَجْلِسٍ مِنْ مَجَالِسِ الأَنْصَارِ إِذْ جَاءَ أَبُو مُوسَى كَأَنَّهُ مَذْعُورٌ فَقَال:َ اسْتَأْذَنْتُ عَلَى عُمَرَ ثَلاثًا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي فَرَجَعْتُ، فَقَالَ مَا مَنَعَكَ؟ قُلْتُ: اسْتَأْذَنْتُ ثَلاثًا فَلَمْ يُؤْذَنْ لِي فَرَجَعْتُ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ رسول الله صلى الله عليه وسلم: “إِذَا اسْتَأْذَنَ أَحَدُكُمْ ثَلاثًا فَلَمْ يُؤْذَنْ لَهُ فَلْيَرْجِعْ”. فَقَالَ: “وَاللَّهِ لَتُقِيمَنَّ عَلَيْهِ بِبَيِّنَةٍ”! أَمِنْكُمْ أَحَدٌ سَمِعَهُ مِنَ النَّبِيِّ رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ فَقَالَ أُبَيُّ بْنُ كَعْبٍ: وَاللَّهِ لا يَقُومُ مَعَكَ إِلا أَصْغَرُ الْقَوْم،ِ فَكُنْتُ أَصْغَرَ الْقَوْمِ فَقُمْتُ مَعَهُ فَأَخْبَرْتُ عُمَرَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ ذَلِكَ”.

“আমি আনসারদের এক মাজলিসে বসে ছিলাম। এমতাবস্থায় আবু মূসা আশআরী (রা) সেখানে আগমন করেন। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি অস্থির বা উৎকণ্ঠিত। তিনি বলেন: আমি উমার (রা) এর ঘরে প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি প্রার্থনা করি।

অনুমতি না দেওয়ায় আমি ফিরে আসছিলাম। উমার (রা) আমাকে ডেকে বলেন: আপনার ফিরে যাওয়ার কারণ কি? আমি বললাম: আমি তিনবার অনুমতি প্রাথনা করি, কিন্তু অনুমাতি জানানো হয় নি। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যদি তোমরা তিনবার অনুমতি প্রার্থনা কর এবং অনুমতি না দেওয়া হয় তাহলে তোমরা ফিরে যাবে।”

তখন উমার (রা) বলেন: আল্লাহর শপথ, এই বর্ণনার উপর আপনাকে অবশ্যই সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। (আবু মুসা বলেন): আপনাদের মধ্যে কেউ কি এই হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে শুনেছেন?

তখন উবাই ইবনু কা’ব (রা) বলেন: আমাদের মধ্যে যার বয়স সবচেয়ে কম সেই আপনার সাথে যাবে। (আবু সাঈদ খুদরী বলেন) আমি উপস্থিতদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়স্ক ছিলাম। আমি আবু মুসার (রা) সাথে যেয়ে উমারকে (রা) বললাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা বলেছেন।”[44]বুখারী, আস—সহীহ ৫/২৩০৫; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১১/২৬—২৭; মুসলিম, … Continue reading

৩. তাবিয়ী উরওয়া ইবনুয যুবাইর (৯৪ হি) বলেন:

إنَّ عُمَرَ نَشَدَ النَّاسَ مَنْ سَمِعَ النَّبِيَّ رسول صلى الله عليه وسلم قَضَى فِي السِّقْطِ؟ فَقَالَ الْمُغِيرَةُ: أَنَا سَمِعْتُهُ قَضَى فِيهِ بِغُرَّةٍ عَبْدٍ أَوْ أَمَةٍ. قَالَ: ائْتِ مَنْ يَشْهَدُ مَعَكَ عَلَى هَذَا. فَقَالَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ: أَنَا أَشْهَدُ عَلَى النَّبِيِّ رسول صلى الله عليه وسلم بِمِثْلِ هَذَا.

“উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) মানুষদের কাছে জানতে চান, আঘাতের ফলে গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু হলে তার দিয়াত বা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী বিধান দিয়েছেন তা কেউ জানে কিনা? তখন মুগীরাহ ইবনু শু’বা (রা) বলেন: আমি শুনেছি যে, তিনি এ বিষয়ে একজন দাস বা দাসী প্রদানের বিধান প্রদান করেছেন।

উমার (রা) বলেন: আপনার সাথে এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য কাউকে আনয়ন করুন। তখন মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুরূপ বিধান দিয়েছেন।”[45]বুখারী, আস—সহীহ ৬/২৫৩১; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১২/২৪৭, মুসলিম, … Continue reading

৪. সাহাবী আম্র ইবনু উমাইয়াহ আদ-দামরী (রা) বলেন:

إن عمر رصى الله عنه مر عليه وهو يساوم بمرط، فقال: ما هذا؟ قال: أريد أن أشتريه وأتصدق به. فاشتراه فدفعه إلى أهله، وقال: إني سمعت رسول الله رسول صلى الله عليه وسلم يقول: ما أعطيتموهن فهو صدقة. فقال عمر: من يشهد معك؟ فأتى عائشة رضي الله عنها فقام وراء الباب، فقالت: من هذا؟ قال: عمرو. قالت: ما جاء بك؟ قال: سمعتِ رسول الله رسول صلى الله عليه وسلم يقول: ما أعطيتموهن فهو صدقة؟ قالت: نعم.

তিনি একটি চাদর ক্রয়ের জন্য তা দাম করছিলেন। এমতাবস্থায় উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) তাঁর নিকট দিয়ে গমন করেন। উমার বলেন: এটি কি? তিনি বলেন: আমি এই চাদরটি ক্রয় করে দান করতে চাই। এরপর তিনি তা ক্রয় করে তাঁর স্ত্রীকে প্রদান করেন এবং বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি: তোমরা স্ত্রীগণকে যা প্রদান করবে তাও দান বলে গণ্য হবে। তখন উমার বলেন: আপনার সাথে সাক্ষী কে আছে? তখন তিনি আয়েশা (রা) এর নিকট গমন করেন এবং দরজার বাইরে দাঁড়ান।

আয়েশা বলেন? কে? তিনি বলেন: আম্র। আয়েশা বলেন: কি জন্য আপনি এসেছেন? তিনি বলেন: আপনি কি শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তোমরা স্ত্রীগণকে যা প্রদান করবে তা দান? আয়েশা বলেন: হ্যাঁ।[46]বাইহাকী, আহমদ ইবনুল হুসাইন (৪৫৮হি.), আস—সুনানুল কুবরা (মাক্কা মুকাররামা, সৌদি … Continue reading

৫. ওয়ালীদ ইবনু আব্দুর রাহমান আল-জুরাশী নামক তাবিয়ী বলেন:

إن عبد الله بن عمر مَرَّ بِأَبِي هُرَيْرَةَ- رضي الله عنهم- وَهُوَ يُحَدِّثُ عَنِ النَّبِيِّ رسول صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ مَنْ تَبِعَ جَنَازَةً فَصَلَّى عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ فَإِنْ شَهِدَ دَفْنَهَا فَلَهُ قِيرَاطَانِ الْقِيرَاطُ أَعْظَمُ مِنْ أُحُدٍ. فَقَالَ لَهُ ابْنُ عُمَرَ: أَبَا هُرَيْرَةَ انْظُرْ مَا تُحَدِّثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم، فَقَامَ إِلَيْهِ أَبُو هُرَيْرَةَ حَتَّى انْطَلَقَ بِهِ إِلَى عَائِشَةَ فَقَالَ لَهَا يَا أُمَّ الْمُؤْمِنِينَ أَنْشُدُكِ بِاللَّهِ أَسَمِعْتِ رَسُولَ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم يَقُولُ مَنْ تَبِعَ جَنَازَةً فَصَلَّى عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ فَإِنْ شَهِدَ دَفْنَهَا فَلَهُ قِيرَاطَانِ فَقَالَتِ: اللَّهُمَّ نَعَمْ.

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) অন্য সাহাবী আবু হুরাইরা (রা) এর নিকট দিয়ে গমন করছিলেন। সে সময় আবু হুরাইরা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করছিলেন। হাদীস বর্ণনার মধ্যে তিনি বলেন: কেউ যদি কারো জানাযার সাথে গমন করে সালাতে অংশ গ্রহণ করে তাহলে সে এক ‘কীরাত’ সাওয়াব অর্জন করবে। আর যদি সে তার দাফনে (কবরস্থ করায়) উপস্থিত থাকে তাহলে সে দুই কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে।

এক কীরাত উহদ পাহাড়ের চেয়েও বড়। তখন আব্দুল্লাহ ইবনু উমর বলেন: আবু হুরাইরা, আপনি ভেবে দেখুন তো আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে কি বলছেন! তখন আবু হুরাইরা (রা) তাকে সাথে নিয়ে আয়েশা (রা) এর নিকট গমন করেন এবং তাঁকে বলেন: হে উম্মুল মুমিনীন, আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম করে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে, “কেউ যদি কারো জানাযার সাথে গমন করে সালাতে অংশ গ্রহণ করে তাহলে সে এক ‘কীরাত’ সাওয়াব অর্জন করবে। আর যদি সে তার দাফনে উপস্থিত থাকে তাহলে সে দুই কীরাত সাওয়াব অর্জন করবে।” তিনি বলেন: হ্যাঁ, অবশ্যই শুনেছি।[47]আহমদ, আল—মুসনাদ ২/২, আহমদ শাকির, মুসনাদু আহমদ (কাইরো, দারুল মাআরিফ, ১৯৫৮) ৬/২১৩, … Continue reading

৪. ২. ৪. বর্ণনাকারীর বিভিন্ন সময়ের বর্ণনার মধ্যে তুলনা করা

কোনো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভুলতা নির্ণয়ের জন্য অন্য একটি পদ্ধতি, তাকে একই বিষয়ে একাধিক সময়ে প্রশ্ন করা। যদি দ্বিতীয় বারের উত্তর প্রথম বারের উত্তরের সাথে হুবহু মিলে যায় তাহলে তার নির্ভুলতা প্রমাণিত হয়। আর উভয়ের বৈপরীত্য অগ্রহণযোগ্যতা প্রমাণিত করে। সাহাবীগণ হাদীসের নির্ভুলতা নির্ণয়ে এই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। একটি উদাহরণ দেখুন।
তাবিয়ী উরওয়া ইবনু যুবাইর বলেন:

قَالَتْ لِي عَائِشَةُ: يَا ابْنَ أُخْتِي، بَلَغَنِي أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَمْرٍو مَارٌّ بِنَا إِلَى الْحَجِّ فَالْقَهُ فَسَائِلْهُ فَإِنَّهُ قَدْ حَمَلَ عَنِ النَّبِيِّ رسول صلى الله عليه وسلم عِلْمًا كَثِيرًا. قَالَ: فَلَقِيتُهُ فَسَاءَلْتُهُ عَنْ أَشْيَاءَ يَذْكُرُهَا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم، قَالَ عُرْوَةُ: فَكَانَ فِيمَا ذَكَرَ أَنَّ النَّبِيَّ رسول صلى الله عليه وسلم قَالَ: إِنَّ اللَّهَ لا يَنْتَزِعُ الْعِلْمَ مِنَ النَّاسِ انْتِزَاعًا وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعُلَمَاءَ فَيَرْفَعُ الْعِلْمَ مَعَهُمْ وَيُبْقِي فِي النَّاسِ رُءُوسًا جُهَّالا يُفْتُونَهُمْ بِغَيْرِ عِلْمٍ فَيَضِلُّونَ وَيُضِلُّونَ. قَالَ عُرْوَةُ: فَلَمَّا حَدَّثْتُ عَائِشَةَ بِذَلِكَ أَعْظَمَتْ ذَلِكَ وَأَنْكَرَتْهُ، قَالَتْ: أَحَدَّثَكَ أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ رسول صلى الله عليه وسلم يَقُولُ هَذَا؟! قَالَ عُرْوَةُ: حَتَّى إِذَا كَانَ قَابِلٌ قَالَتْ لَهُ: إِنَّ ابْنَ عَمْرٍو قَدْ قَدِمَ فَالْقَهُ ثُمَّ فَاتِحْهُ حَتَّى تَسْأَلَهُ عَنِ الْحَدِيثِ الَّذِي ذَكَرَهُ لَكَ فِي الْعِلْمِ. قَالَ: فَلَقِيتُهُ فَسَاءَلْتُهُ فَذَكَرَهُ لِي نَحْوَ مَا حَدَّثَنِي بِهِ فِي مَرَّتِهِ الأُولَى. قَالَ عُرْوَةُ: فَلَمَّا أَخْبَرْتُهَا بِذَلِكَ قَالَتْ: “مَا أَحْسَبُهُ إِلا قَدْ صَدَقَ، أَرَاهُ لَمْ يَزِدْ فِيهِ شَيْئًا وَلَمْ يَنْقُصْ.

আমার খালাম্মা আয়েশা (রা) আমাকে বলেন: বেটা,শুনেছি সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু আম্র ইবনুল আস (রা) আমাদের এলাকা দিয়ে হজ্জে গমন করবেন। তুমি তাঁর সাথে দেখা কর এবং তার থেকে প্রশ্ন করে শিখ। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনেক জ্ঞান শিক্ষা করেছেন।

উরওয়া বলেন: আমি তখন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করি এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করি। তিনি সে সব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস বর্ণনা করেন।

তিনি যে সকল কথা বলেন, তার মধ্যে তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয় আল্লাহ মানুষ থেকে জ্ঞান ছিনিয়ে নিবেন না। কিন্তু তিনি জ্ঞানীদের কব্জা করবেন (মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের গ্রহণ করবেন) ফলে তাদের সাথে জ্ঞানও উঠে যাবে।

মানুষের মধ্যে মুর্খ নেতৃবৃন্দ অবশিষ্ট থাকবে, যারা ইলম ছাড়াই ফাতওয়া প্রদান করবে এবং এভাবে নিজেরা বিভ্রান্ত হবে এবং অন্যদেরও বিভ্রান্ত করবে।” উরওয়া বলেন: আমি যখন আয়েশাকে একথা বললাম তখন তিনি তা গ্রহণ করতে আপত্তি করলেন। তিনি বলেন: তিনি কি তোমাকে বলেছেন যে, একথা তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন?

উরওয়া বলেন: পরের বছর আয়েশা আমাকে বলেন: আব্দুল্লাহ ইবনু আমর আগমন করেছেন। তুমি তাঁর সাথে সাক্ষাত করে তাঁর সাথে কথাবার্তা বল। কথার ফাঁকে ইলম উঠে যাওয়ার হাদীসটির বিষয়েও কথা তুলবে। উরওয়া বলেন: আমি তখন তাঁর সাথে সাক্ষাত করি এবং তাঁকে প্রশ্ন করি। তিনি তখন আগের বার যেভাবে বলেছিলেন সেভাবেই হাদীসটি বললেন।

উরওয়া বলেন: আমি যখন আয়েশা (রা) কে বিষয়টি জানালাম তখন তিনি বলেন: আমি বুঝতে পারলাম যে, আব্দুল্লাহ ইবনু আম্র ঠিকই বলেছেন। আমি দেখছি যে, তিনি একটুও বাড়িয়ে বলেন নি বা কমিয়ে বলেন নি।[48]মুসলিম, আস—সহীহ ৪/২০৫৮—২০৫৯।

এখানেও আমরা হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে সাহাবীগণের অকল্পনীয় সাবধানতার নমুনা দেখতে পাই। আয়েশা (রা) আব্দুল্লাহ ইবনু উমরের সততা বা সত্যবাদিতায় সন্দেহ করেন নি। কিন্তু সৎ ও সত্যবাদী ব্যক্তিরও ভুল হতে পারে। কাজেই বিনা নিরীক্ষায় তাঁরা কিছুই গ্রহণ করতে চাইতেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামে কথিত কোনো হাদীস তারা নিরীক্ষার আগেই ভক্তিভরে হৃদয়ে স্থান দিতেন না।

৪. ২. ৫. বর্ণনাকারীকে শপথ করিয়ে বর্ণনার নির্ভরতা যাচাই করা

বর্ণনা বা সাক্ষ্যের নির্ভুলতা যাচাইএর জন্য প্রয়োজনে বর্ণনাকারী বা সাক্ষীকে শপথ করানো হয়। সত্যপরায়ণ ও আল্লাহভীরু মানুষ ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলেন না। তবে তাঁর স্মৃতি তাকে ধোকা দিতে পারে বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে তিনি নিপতিত হতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর নামে শপথ করতে হলে তিনি কখনো পরিপূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলবেন না।

এজন্য সত্যপরায়ণ ব্যক্তির জন্য শপথ করানো সাক্ষ্য বা বক্তব্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের জন্য কার্যকর পদ্ধতি। তবে মিথ্যাবাদির জন্য শপথ যথেষ্ট নয়। তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশ্ন (cross interrogation) এর মাধ্যমে তার বক্ত্যব্যের যথার্থতা যাচাই করতে হয়।

সাহাবীগণ সকলেই ছিলেন সত্যপরায়ণ অত্যন্ত আল্লাহভীরু মানুষ। তা সত্ত্বেও অনিচ্ছাকৃত ভুলের সম্ভাবনা দূর করার জন্য সাহাবীগণ কখনো কখনো হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীকে শপথ করাতেন। আলী ইবনু আবী তালিব (রা) বলেন:

إِنِّي كُنْتُ رَجُلا إِذَا سَمِعْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم حَدِيثًا نَفَعَنِي اللَّهُ مِنْهُ بِمَا شَاءَ أَنْ يَنْفَعَنِي بِهِ. وَإِذَا حَدَّثَنِي رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِهِ اسْتَحْلَفْتُهُ فَإِذَا حَلَفَ لِي صَدَّقْتُهُ.

“আমি এমন একজন মানুষ ছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে কোনো কথা নিজে শুনলে আল্লাহ আমাকে তা থেকে তাঁর মর্জিমত উপকৃত হওয়ার তাওফীক প্রদান করতেন। আর যদি তাঁর কোনো সাহাবী আমাকে কোনো হাদীস শুনাতেন তাহলে আমি তাকে শপথ করাতাম। তিনি শপথ করলে আমি তার বর্ণিত হাদীস সত্য বলে গ্রহণ করতাম।”[49]তিরমিযী, আস—সুনান ২/২৫৭—২৫৮; ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/৪৪৬।

৪. ২. ৬. বর্ণনার অর্থ কুরআন ও হাদীসের প্রসিদ্ধ নির্দেশের সাথে মিলিয়ে দেখা

সাহাবীগণ পূর্বোল্লিখিত নিরীক্ষা পদ্ধতিসমূহের মাধ্যমে হাদীস বর্ণনাকারীর বক্ত্যব্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের সাথে সাথে তার অর্থও বিচার করতেন। যদি কারো বক্তব্য কুরআন কারীমের বা প্রসিদ্ধ ও সুপরিচিত হাদীস সমূহের স্পষ্ট নির্দেশনার বিপরীত হতো বা বাহ্যিক অর্থের সাথে অসঞ্জস হতো তাহলে তাঁরা তাঁর হাদীস গ্রহণ করতেন না। তাঁরা বর্ণনাকারীর সত্যবাদিতায় সন্দেহ করতেন না। তবে তিনি বক্তব্যটি সঠিক অর্থে বর্ণনা করতে পারেন নি বলেই ধরে নিতেন। ২/১ টি উদাহরণ দেখুন।

১. আবু হাস্সান আল-আ’রাজ নামক তাবিয়ী বলেন:
إنَّ رَجُلَيْنِ دَخَلا عَلَى عَائِشَةَ فَقَالا: إِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ يُحَدِّثُ أَنَّ نَبِيَّ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقُولُ: إِنَّمَا الطِّيَرَةُ فِي الْمَرْأَةِ وَالدَّابَّةِ وَالدَّارِ. قَالَ: فَطَارَتْ شِقَّةٌ مِنْهَا فِي السَّمَاءِ وَشِقَّةٌ فِي الْأَرْضِ!- وفي رواية أخرى: فَغَضِبَتْ غَضَبًا شَدِيدًا فَطَارَتْ شُقَّةٌ مِنْهَا فِي السَّمَاءِ وَشُقَّةٌ فِي الْأَرْضِ!-  فَقَالَتْ: وَالَّذِي أَنْزَلَ الْقُرْآنَ عَلَى أَبِي الْقَاسِمِ رسول صلى الله عليه وسلم مَا هَكَذَا كَانَ يَقُولُ، وَلَكِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم كانَ يَقُولُ: “كَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ الطِّيَرَةُ فِي الْمَرْأَةِ وَالدَّارِ وَالدَّابَّةِ”، ثُمَّ قَرَأَتْ عَائِشَةُ: ]مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الأَرْضِ وَلا فِي أَنْفُسِكُمْ  إِلا فِي كِتَابٍ[.

দুই ব্যক্তি আয়েশা (রা) -এর নিকট গমন করে বলেন: আবু হুরাইরা (রা) বলছেন যে, নাবীউল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: নারী, পশু বা বাহন ও বাড়িঘরের মধ্যে অযাত্রা ও অশুভত্ব আছে। একথা শুনে আয়েশা (রা) এত বেশি রাগন্বিত হন যে, মনে হলো তাঁর দেহ ক্রোধে ছিন্নভিন্ত হয়ে আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বলেন: যিনি আবুল কাসিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর যিনি কুরআন নাযিল করেছেন তাঁর কসম, তিনি এভাবে বলতেন না।

নাবীউল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন: “জাহিলিয়্যাতের যুগের মানুষেরা বলত: নারী, বাড়ি ও পশু বা বাহনে অশুভত্ব আছে। এরপর আয়েশা (রা) কুরআন কারীমের আয়াত তিলাওয়াত করেন:[50]সূরা—৫৭: আল—হাদীস, আয়াত ২২।` “পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদিগের উপর যে বিপর্যয় আসে আমি তা সংঘটিত করবার পূর্বেই তা লিপিবদ্ধ থাকে।”[51]আহমদ, আল—মুসনাদ ৬/১৫০, ২৪৬।

এখানে আয়েশা (রা) আবু হুরাইরা (রা) এর বর্ননা গ্রহণ করেন নি। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা শুনেছেন এবং কুরআনের যে আয়াত পাঠ করেছেন তার আলোকে এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

২. উমরাহ বিনতু আব্দুর রাহমান বলেন:

أَنَّهَا سَمِعَتْ عَائِشَةَ وَذُكِرَ لَهَا أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ يَقُولُ: (في رواية: سمعت رسول الله رَسُولِ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم يقول) إِنَّ الْمَيِّتَ لَيُعَذَّبُ بِبُكَاءِ الْحَيِّ فَقَالَتْ عَائِشَةُ: يَغْفِرُ اللَّهُ لأَبِي عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَمَا إِنَّهُ لَمْ يَكْذِبْ وَلَكِنَّهُ نَسِيَ أَوْ أَخْطَأَ (وفي رواية لمسلم: وَلَكِنَّ السَّمْعَ يُخْطِئُ) (وفي رواية للترمذي: وَلَكِنَّهُ وَهِمَ)؛ إِنَّمَا مَرَّ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى يَهُودِيَّةٍ يُبْكَى عَلَيْهَا فَقَالَ: “إِنَّهُمْ لَيَبْكُونَ عَلَيْهَا وَإِنَّهَا لَتُعَذَّبُ فِي قَبْرِهَا” (وفي رواية لمسلم: لا تزر وازرة وزر أخرى).

আয়েশা (রা) -এর নিকট উল্লেখ করা হয় যে, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করছেন যে, ‘জীবিতর ক্রন্দনে মৃতব্যক্তি শাস্তি পায়।’ তখন আয়েশা (রা) বলেন: আল্লাহ ইবনু উমারকে ক্ষমা করুন। তিনি মিথ্যা বলেন নি। তবে তিনি বিস্মৃত হয়েছেন বা ভুল করেছেন (দ্বিতীয় বর্ণনায়: শুনতে অনেক সময় ভুল হয়)।

প্রকৃত কথা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ইহুদী মহিলার (কবরের) নিকট দিয়ে গমন করেন, যার জন্য তার পরিজনেরা ক্রন্দন করছিল। তিনি তখন বলেন: ‘এরা তার জন্য ক্রন্দন করছে এবং সে তার কবরে শাস্তি পাচ্ছে।’ আল্লাহ বলেছেন[52]সূরা ৬: আল—আন‘আম: ১৬৪; সূরা ১৭: আল—ইসরা: ১৫; সূরা ৩৫: ফাতির: ১৮, সূরা ৩৯: আয—যুমার: … Continue reading: ‘এক আত্মা অন্য আত্মার পাপের বোঝা বহন করবে না।’[53]মুসলিম, আস—সহীহ ২/৬৪০—৬৪৩, তিরমিযী, আস—সুনান ৩/৩৩৭।

৩. ফাতিমা বিনতু কাইস (রা) নামক একজন মহিলা সাহাবী বলেন যে, তাঁর স্বামী তাঁকে তিন তালাক প্রদান করেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যে, তিনি (ঐ মহিলা) ইদ্দত-কালীন আবাসন ও ভরণপোষণের খরচ পাবেন না। তাঁর এই কথা শুনে খলীফা উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন:

لا نترك كتاب الله وسنة نبينا صلى الله عليه وسلم لقول امرأة لا ندري لعلها حفظت أو نسيت (لا ندري أحفظت ذلك أم لا) لها السكنى والنفقة؛ قال الله عز وجل: لا تخرجوهن من بيوتهن ولا يخرجن إلا أن يأتين بفاحشة مبينة.

আমরা আল্লাহর গ্রন্থ ও আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত একজন মহিলার কথায় ছেড়ে দিতে পারি না। কারণ আমরা বুঝতে পারছি না যে, তিনি বিষয়টি মুখস্থ রেখেছেন না ভুলে গিয়েছেন। তিন-তালাক প্রাপ্ত মহিলাও ইদ্দত-কালীন আবাসন ও খোরপোশ পাবেন। মহিমাময় পরাক্রমশালী আল্লাহ বলেছেন[54]সূরা—৬৫: আত—তালাক, আয়াত ১।: “তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বহিষ্কার করো না এবং তারাও যেন বের না হয়, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়।”[55]মুসলিম, আস—সহীহ ২/১১১৮, আবু দাউদ, আস—সুনান ২/২৯৭।

৪. ৩. বর্ণনাকারীর নামোল্লেখ করা ও তার সততার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া

সাহাবীগণের যুগের প্রথম দিকে সাহাবীগণই হাদীস বর্ণনা করতেন। এক সাহাবী অন্য সাহাবীকে অথবা পরবর্তী প্রজন্ম তাবিয়ীগণকে হাদীস শুনাতেন ও শিক্ষা দিতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তে-কালের ২০/২৫ বছরের মধ্যে একদিকে যেমন অনেক সাহাবী ইন্তেকাল করেন, তেমনি অপরদিকে অনেক তাবিয়ী হাদীস বর্ণনা ও শিক্ষাদান শুরু করেন। এ পর্যায়ে কোনো কোনো নও মুসলিম তাবিয়ীর মধ্যে মধ্যে ইচ্ছাকৃত মিথ্যার প্রবণতা দেখা দেয়। তখন সাহাবীগণ হাদীস গ্রহণের বিষয়ে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে থাকেন।

এক সাহাবী অন্য সাহাবীকে হাদীস বর্ণনা করলে শ্রোতা বা শিক্ষার্থী সাহাবী বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত সততা ও সত্যপরায়ণতায় কোনো সন্দেহ করতেন না বা তিনি নিজ কর্ণে হাদীসটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন না অন্য কেউ তাকে বলেছেন সে বিষয়েও প্রশ্ন করতেন না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচার্য প্রাপ্ত সকল মানুষই ছিলেন তাঁরই আলোয় আলোকিত মহান মানুষ এবং সত্যবাদিতায় আপোষহীন। তবে বিস্মৃতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা হৃদয়ঙ্গমের অপুর্ণতা জনিত ভুল হতে পারে বিধায় উপরোক্ত বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাঁরা বর্ণিত হাদীসের নির্ভুলতা যাচাই করতেন।

তাবিয়ী বর্ণনাকারীদের হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা উপরোক্ত নিরীক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত দুইটি বিষয় যুক্ত করেন। প্রথমত, তাঁরা বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত সত্যপরায়ণতা ও বিশ্বস্ততার বিষয়ে অনুসন্ধান করতেন এবং দ্বিতীয়ত, তাঁরা বর্ণনাকারী কার নিকট থেকে হাদীসটি শুনেছেন তা (reference) জানতে চাইতেন। প্রথম বিষয়টিকে হাদীস বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘عدالة’ যাচাই করা বলা হয়। আমরা বাংলা একে ‘ব্যক্তিগত সততা ও সত্যপরায়নতা’ যাচাই বলে অভিহিত করতে পারি। দ্বিতীয় বিষয়টিকে হাদীসের পরিভাষায় ‘سند’ বর্ণনা বলা হয়। বাংলায় আমরা একে ‘সূত্র (reference) উল্লেখ করা’ বলতে পারি।

হযরত উসমানের খেলাফতের যুগে (২৩-৩৫ হি) মদীনার কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত নও-মুসলিমদের মধ্যে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে মুসলিম উম্মার মধ্যে বিভক্তি ও হানাহানি ঘটে এবং নও-মুসলিমদের মধ্যে সত্যপরায়ণতার কমতি দেখা দেয়। তখন থেকেই সাহাবীগণ উপরের দুইটি পদ্ধতি গ্রহণ করেন। প্রথম হিজরী শতকের প্রখ্যাত তাবিয়ী মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন (১১০ হি) বলেন:
لَمْ يَكُونُوا يَسْأَلُونَ عَنِ الإِسْنَادِ فَلَمَّا وَقَعَتِ الْفِتْنَةُ قَالُوا سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ فَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ فَيُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ وَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ فَلا يُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ.

“তাঁরা (সাহাবীগণ) সনদ বা তথ্যসূত্র সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করতেন না। যখন (উসমান ইবনু আফ্ফানের খেলাফতের শেষদিকে: ৩০-৩৫ হি) ফিতনা-ফাসাদ ঘটে গেল তখন তাঁরা বললেন: তোমাদেরকে যারা হাদীস বলেছেন তাদের নাম উল্লেখ কর। কারণ দেখতে হবে, তারা যদি আহলুস সুন্নাত বা সুন্নাত পন্থীগণের অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হবে। আর তারা যদি আহলুল বিদ‘আত বা বিদ‘আত পন্থীগণের অন্তর্ভুক্ত হন তাহলে তাদের হাদীস গ্রহণ করা হবে না।”[56]মুসলিম, আস—সহীহ ১/১৫।

প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (৬৮ হি) বলেন:

إِنَّمَا كُنَّا نَحْفَظُ الْحَدِيثَ وَالْحَدِيثُ يُحْفَظُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم فَأَمَّا إِذْ رَكِبْتُمْ كُلَّ صَعْبٍ وَذَلُولٍ فَهَيْهَاتَ.

“আমরা তো হাদীস মুখস্থ করতাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস (যে কোনো বর্ণনাকারী থেকে) মুখস্থ করা হতো। কিন্তু তোমরা যেহেতু খানখন্দক ও ভালমন্দ সব পথেই চলে গেলে সেহেতু এখন (বর্ণনাকারীর ব্যক্তি বিচার ছাড়া) কোনো কিছু গ্রহণ করার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত।”[57]মুসলিম, আস—সহীহ ১/১৩।

তাবিয়ী মুজাহিদ (১০৪ হি) বলেন:

جَاءَ بُشَيْرٌ الْعَدَوِيُّ إِلَى ابْنِ عَبَّاسٍ فَجَعَلَ يُحَدِّثُ وَيَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ رسول الله رسول صلى الله عليه وسلم، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم ، فَجَعَلَ ابْنُ عَبَّاسٍ لا يَأْذَنُ لِحَدِيثِهِ وَلا يَنْظُرُ إِلَيْهِ. فَقَالَ: يَا ابْنَ عَبَّاسٍ مَالِي لا أَرَاكَ تَسْمَعُ لِحَدِيثِي أُحَدِّثُكَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم وَلا تَسْمَعُ؟ فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: إِنَّا كُنَّا مَرَّةً إِذَا سَمِعْنَا رَجُلا يَقُولُ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ رسول صلى الله عليه وسلم ابْتَدَرَتْهُ أَبْصَارُنَا وَأَصْغَيْنَا إِلَيْهِ بِآذَانِنَا فَلَمَّا رَكِبَ النَّاسُ الصَّعْبَ وَالذَّلُولَ لَمْ نَأْخُذْ مِنَ النَّاسِ إِلا مَا نَعْرِفُ.

“বাশীর ইবনু কা’ব আল-আদাবী নামক একজন প্রাচীন তাবিয়ী আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাসের (রা) নিকট আগমন করেন এবং হাদীস বলতে শুরু করেন। তিনি বলতে থাকেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। কিন্তু ইবনু আব্বাস (রা) তার দিকে কর্ণপাত ও দৃষ্টিপাত করেন না।

তখন বাশীর বলেন: হে ইবনু আব্বাস, আমার কি হলো! আপনি আমার হাদীস শুনছেন কি? আমি আপনাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করছি অথচ আপনি কর্ণপাত করছেন না!?

তখন ইবনু আব্বাস বলেন: একসময় ছিল যখন আমরা যদি কাউকে বলতে শুনতাম: ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন’ তখনই আমাদের দৃষ্টিগুলি তার প্রতি আবদ্ধ হয়ে যেত এবং আমরা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তার প্রতি কর্ণপাত করতাম। কিন্তু যখন মানুষ খানাখন্দক ভালমন্দ সব পথেই চলে গেল তখন থেকে আমরা আর মানুষদের থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করি না, শুধুমাত্র সুপরিচিত ও পরিজ্ঞাত বিষয় ব্যতিরেকে।[58]বাশীর ইবনু কাব ইবনু উবাই রাসূলুল­াহ সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­ামের … Continue reading

৪. ৪. হাদীস বর্ণনা ও গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান

উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখছি যে, সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে ও গ্রহণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। পাশাপাশি তাঁরা অন্য সবাইকে এভাবে সতর্কতা অবলম্বন করতে উৎসাহ ও নির্দেশ প্রদান করতেন। এক্ষেত্রে কোনোরূপ অবহেলা বা ঢিলেমি তাঁরা সহ্য করতেন না। তাঁরা বিনা যাচাইয়ে হাদীস গ্রহণ করতে নিষেধ করতেন।

অনেক সময় কারো হাদীস বর্ণনায় অনিচ্চাকৃত ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা শ্রোতাদের মধ্যে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাঁকে হাদীস বলতে নিষেধ করতেন। এখানে কয়েকটি নমুনা উল্লেখ করছি।

১. তাবিয়ী আবু উসমান আন-নাহদী বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন,
بحسب المرء من الكذب أن يحدث بكل ما سمع
“একজন মানুষের মিথ্যা বলার জন্য এই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে সবই বর্ণনা করবে।”[59]মুসলিম, আস—সহীহ ১/১১।

২. তাবিয়ী আবুল আহওয়াস বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা) বলেন:
بحسب المرء من الكذب أن يحدث بكل ما سمع
“একজন মানুষের মিথ্যা বলার জন্য এই যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে সবই বর্ণনা করবে।”[60]মুসলিম, আস—সহীহ ১/১১।

৩. সাহাবী আব্দুর রাহমান ইবনু আউফ (রা) এর পুত্র মদীনার প্রখ্যাত আলিম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইবরাহীম ইবনু আব্দুর রাহমান (৯৫ হি) বলেন:

بعث عمر بن الخطاب إلى عبد الله بن مسعود، وإلى أبي الدرداء، وإلى أبي مسعود الأنصاري فقال: ما هذا الحديث الذي تكثرون على رسول الله رسول صلى الله عليه وسلم ؟ فحبسهم بالمدينة حتى استشهد.

“উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা), আবু দারদা (রা) ও আবু মাসঊদ (রা) কে ডেকে পাঠান। তিনি তাঁদেরকে বলেন: আপনারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এত বেশি হাদীস বলছেন কেন? এরপর তিনি তাঁদেরকে মদীনাতেই অবস্থানের নির্দেশ দেন। তাঁর শাহাদত পর্যন্ত তাঁরা মদীনাতেই ছিলেন।”[61]তাবারানী, সুলাইমান ইবনু আহমদ (৩৬০হি.) আল—মু’জামুল আউসাত (কাইরো, দারুল হাদীস, … Continue reading

এই তিনজন সাহাবী হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। উমার ইবনুল খাত্তব (রা) তাঁদের নির্ভুল হাদীস বলার ক্ষমতা বা যোগ্যতার বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেন নি। কিন্তু বেশি হাদীস বললে কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে।

বিশেষত, কূফা বা সিরিয়ার মত প্রত্যন্ত এলাকায় যেখানে ইসলামী বিজয়ের সেই প্রথম দিনগুলিতে অধিকাংশ নও মুসলিম অনারব বসবাস করতেন, তাদের মধ্যে বেশি হাদীস বর্ণনা করলে অনেক শ্রোতা তা সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম ও মুখস্থ করতে পারবেন না বলে আশঙ্কা থাকে। এজন্য হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য উমার ইবনুল খাত্তাব তাঁদেরকে মদীনায় অবস্থানের নির্দেশ প্রদান করেন।

৫. উপসংহার: হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষায় পরবর্তী মুহাদ্দিসগনের পদ্ধতি

উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, হাদীসের বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সাহাবীগণ কঠোরতম নিরীক্ষা পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। তাবিয়ীগণের যুগ থেকে পরবর্তী সকল যুগে মুহাদ্দিসগণ হাদীসের নির্ভুলতা ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে সাহাবীগণের উক্ত নিরীক্ষা পদ্ধতিসমূহের অনুসরণ করেছেন। পৃথক প্রবন্ধে আমরা দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় তিন শতাব্দী যাবৎ মুহাদ্দিসদের নিরীক্ষা পদ্ধতি আলোচনার আশা রাখি।

এখানে সংক্ষেপে তাঁদের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা দিয়ে আমরা আমাদের প্রবন্ধ শেষ করব।
মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ সাহাবীগণের কর্মধারার আলোকে মূলত দুইটি বিষয়ের উপর নির্ভর করেছেন :

প্রথমত : বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত জীবনের সততা, নিষ্ঠা ও ধার্মিকতা বা (عدالة বিচার)।

দ্বিতীয়ত : হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তার বিশুদ্ধ ও নির্ভুল বর্ণনার ক্ষমতা বা (ضبط বিচার)।

প্রথম বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তাঁরা হাদীস বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত জীবন, ধার্মিকতা, সততা ইত্যাদি বিষয়ে নিজেরা লক্ষ্য করতেন বা তাঁর এলাকার আলেম ও মুহাদ্দিসগণকে প্রশ্ন করতেন। দ্বিতীয় বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তাঁর উক্ত বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীসগুলিকে অন্যান্য বর্ণনাকারীর বর্ণিত হাদীসের সাথে মিলিয়ে দেখতেন। এভাবে সার্বিক নিরীক্ষা (Cross Examine) এর মাধ্যমে তাঁর বর্ণনার বিশুদ্ধতা নির্ধারণ করতেন।

এক্ষেত্রে তাঁরা কোর্টের বিচারক, উকিল ও জুরিগণের পদ্ধতিকে (Cross Examine) বা তুলনামূলক নিরীক্ষা করতেন। তারা হাদীস বর্ণনাকারীর ব্যক্তিগত পরিচয়, তাঁর বর্ণিত সকল হাদীস, তার উস্তাদের পরিচয়, উস্তাদের অন্যান্য ছাত্রগণের পরিচয়, তাদের বর্ণিত সকল হাদীস ইত্যাদি সব কিছু সংগ্রহ করে সবকিছুর তুলনামুলক পরীক্ষার মাধ্যমে উক্ত ব্যক্তির বর্নিত হাদীসটির সত্যাসত্য ও বিশুদ্ধতা নির্ণয় করেছেন।

উভয় বিষয় নিশ্চিত হলেই তাঁরা উক্ত ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস গ্রহণ করতেন। এ বিষয়ে তাঁদের মূলনীতিই হলো “শুধুমাত্র সৎ ও পূর্ণ ধার্মিক ব্যক্তির বিশুদ্ধ বর্ণনাই গ্রহণ করা হবে।” সৎ ব্যক্তির ভুল বর্ণনা বা অসৎ ব্যক্তির শুদ্ধ বর্ণনা কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়।

উপরের উভয় বিষয় নিশ্চিত করণ ও তুলনামূল নিরীক্ষার জন্য সবচেয়ে প্রধান অবলম্বন প্রাসঙ্গিক সকল তথ্য সংগ্রহ ও তুলনা করা। মহান আল্লাহ উম্মাতে মুহাম্মাদীর প্রথম যুগের মহান মানুষদেরকে তাঁর মহান রাসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস সংরক্ষণের বিষয়ে একটি সঠিক ও সময়োপযোগী কর্মের তাওফীক প্রদান করেন।

প্রথম হিজরী শতক থেকে সাহাবী, তাবিয়ী ও তৎপরবর্তী যুগের আলিমগণ মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি গ্রামগঞ্জ, শহর ও জনপদ ঘুরে ঘুরে সকল হাদীস ও বর্ণনাকারীগণের তথ্যাদি সংগ্রহ করতেন।

প্রত্যেক মুহাদ্দিস ইমাম দীর্ঘ কয়েক বছর বা কয়েক যুগ এভাবে প্রতিটি জনপদে গমন করে সকল জনপদের সকল ‘রাবী’ বা মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন ও লিপিবদ্ধ করেছেন। হাদীস গ্রহণের সময় তাঁরা সংশ্লিষ্ট ‘রাবী’’-কে বিভিন্ন প্রশ্ন করে তার বর্ণনার যথার্থতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছেন।

সাথে সাথে তার ব্যক্তিগত সততা (عدالة), তার শিক্ষকগণ এবং এলাকার অন্যান্য ‘রাবীগণ’ এর বিষয়ে সেই এলাকার প্রসিদ্ধ আলিম, মুহাদ্দিস ও শিক্ষার্থীগণকে প্রশ্ন করেছেন। এভাবে সংগৃহীত সকল তথ্য তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা সকল ‘রাবী’ ও তাদের বর্ণিত সকল হাদীসের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান প্রদান করেছেন।

সনদ বা রেফারেন্স ছাড়া কোনো হাদীসই তাঁরা গ্রহণ করতেন না। হাদীস বর্ণনাকারীকে অবশ্যই তাঁর শিক্ষক থেকে শুরু করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত সূত্র উল্লেখ করতে হতো। ২য় বা ৩য় হিজরী শতকে কোনো হাদীস বর্ণনাকারী যদি বলতেন: “আমাকে ‘ক’ বলেছেন, তিনি ‘খ’ এর নিকট থেকে শুনেছেন, তিনি ‘গ’ এর নিকট থেকে শুনেছেন,

তিনি অমুক সাহাবী থেকে শুনেছেন…” তাহলে হাদীস সংগ্রহকারী মুহাদ্দিস ‘ক’ এর সকল ছাত্রের বর্ণিত হাদীস, ‘খ’ এর সকল ছাত্রের বর্ণিত হাদীস, ‘গ’ এর সকল ছাত্রের বর্ণিত হাদীস এবং উক্ত সাহাবীর সকল ছাত্রের বর্ণিত হাদীস একত্রিত করে তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে উক্ত বর্ণনাকারীর নির্ভুলতা যাচাই করতেন।

এখানে একটি উদাহরণ উল্লেখ করেই আমরা শেষ করব। দ্বিতীয় হিজরী শতকের মিশরের একজন প্রসিদ্ধ আলেম, ফকীহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন আবু আব্দুর রাহমান আব্দুল্লাহ ইবনু লাহী‘য়া ইবনু উক্ববা আল-হাদরামী আল-গাফিকী (১৭৪ হি)।

তিনি একজন প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন এবং অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। মুহাদ্দিসগণ তাঁর বর্ণিত সকল হাদীস তুলনামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে দেখতে পেয়েছেন যে, তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ভুলের পরিমাণ খুবই বেশি।

মুহাদ্দিসগণ তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলি তাঁর নিকট থেকে বা তাঁর ছাত্রদের নিকট থেকে সংকলিত করেছেন। এরপর তিনি যেসকল উস্তাদের সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের অন্যান্য ছাত্রদের থেকে হাদীসগুলি সংগ্রহ ও সংকলন করেছেন। এরপর এ সকল বর্ণনার সনদ ও মতনের তারতম্য দেখতে পেয়ে ‘ইবনু লাহীয়াহ’-কে হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে দুর্বল বলে চিহ্নিত করেছেন।

ইবনু লাহীয়াহ-এর মারাত্মক ভুলের উদাহরণ হিসাবে ইমাম মুসলিম বলেন: আমাদেরকে যুহাইর ইবনু হারব বলেছেন, আমাদেরকে ইসহাক ইবনু ঈসা বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুল্লাহ ইবনু লাহীয়াহ বলেছেন, মূসা ইবনু উকবাহ (১৪১ হি) আমার কাছে লিখে পাঠিয়েছেন, আমাকে বুস্র ইবনু সাঈদ বলেছেন, যাইদ ইবনু সাবেত (রা) বলেছেন:
(احتجم رسول الله صلى الله عليه وسلم في المسجد)
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদের মধ্যে হাজামত করেন বা সিংগার মাধ্যমে দেহ থেকে রক্ত বের করেন।” ইবনু লাহীআর ছাত্র ইসহাক ইবনু ঈসা বলেন: আমি ইবনু লাহীআহকে বললাম: তাঁর বাড়ীর মধ্যে কোনো মসজিদ বা নামাযের স্থানে? তিনি বলেন: মসজিদে নববীর মধ্যে।”

ইমাম মুসলিম বলেন: হাদীসটির বর্ণনা সকল দিক থেকে বিকৃত। এর সনদ (মূল কথা বা ঃবীঃ) ও মতন (তথ্য সূত্র) উভয় ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল হয়েছে। ইবনু লাহীয়াহ এর মতনের শব্দ বিকৃত করেছেন এবং সনদে ভুল করেছেন। এই হাদীসের সহীহ বিবরণ আমি উল্লেখ করছি।

আমাকে মুহাম্মাদ ইবনু হাতিম বলেন, আমাদেরকে বাহয ইবনু আসাদ বলেন, আমাদেরকে উহাইব ইবনু খালিদ ইবনু আজলান (১৬৫ হি) বলেন, আমাকে মূসা ইবনু উকবাহ বলেন, আমি আবুন নাদর সালিম ইবনু আবু উমাইয়াহ (১২৯ হি)- কে বলতে শুনেছি, তিনি বুসর ইবনু সাঈদ থেকে, তিনি যাইদ ইবনু সাবিত থেকে বলেছেন,

إن النبي رسول صلى الله عليه وسلم اتخذ حجرة في المسجد من حصير فصلى رسول الله رسول صلى الله عليه وسلم فيها ليالي … 

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদের মধ্যে চাটাই দিয়ে একটি ছোট ঘর বানিয়ে তার মধ্যে কয়েক রাত সালাত আদায় করেন…।”

ইমাম মুসলিম বলেন: আমাকে মুহাম্মাদ ইবনুল মুসান্না বলেন, আমাদেরকে মুহাম্মাদ ইবনু জা’ফর বলেছেন, আমাদেরকে আব্দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ইবনু আবী হিনদ আল-ফারাযী (১৪৫ হি) বলেছেন, আমাদেরকে আবুন নাদর সালিম বলেছেন, তিনি বুসর ইবনু সাঈদ থেকে, তিনি যাইদ ইবনু সাবিত থেকে, তিনি বলেন:

احتجر رسول الله رسول صلى الله عليه وسلم بخصفة أو حصير…

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাটাই দিয়ে মসজিদের মধ্যে একটি ঘর বানিয়ে নেন …।”

এভাবে আমরা সঠিক বর্ণনা পাচ্ছি উহাইব ইবনু খালিদ (১৬৫ হি) থেকে মূসা ইবনু উকবাহ থেকে, আবুন নাদর থেকে। এছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনু সাঈদ ইবনু আবী হিনদ আল-ফারাযী (১৪৫ হি) দ্বিতীয় সূত্রে আবুন নাদর থেকে যে বর্ণনা করেছেন তাও উল্লেখ করলাম। ইবনু লাহিয়া এখানে হাদীসের মতন বর্ণনায় ভুল করেছেন তার কারণ তিনি হাদীসটি মূসার নিকট থেকে স্বকর্ণে শুনেন নি।

শুধুমাত্র লিখে পাঠানো পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করেছেন, যা তিনি উল্লেখ করেছেন। (এজন্য তিনি احتجر বা ঘর বানিয়েছেন শব্দটিকে احتجم বা রক্ত বাহির করেছেন বলে পড়েছেন।) যারা মুহাদ্দিসের নিজের মুখ থেকে স্বকর্ণে না শুনে বা মুহাদ্দিসকে নিজে পড়ে না শুনিয়ে শুধুমাত্র লিখিত পাণ্ডুলিপির উপর নির্ভর করে হাদীস বর্ণনা করেন তাদের সকলের ক্ষেত্রেই আমরা এই বিকৃতির ভয় পাই।

আর সনদের ভুল হলো, মূসা ইবনু উকবাহ হাদীসটি আবুন নাদর সালিম-এর নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন। আবুন নাদর হাদীসটি বুসর ইবনু সাঈদ থেকে শিখেছেন। কিন্তু ইবনু লাহিয়াহ সনদ বর্ণনায় আবুন নাদর- এর নাম উল্লেখ না করে বলেছেন: মূসা হাদীসটি বুসর থেকে শুনেছেন।[62]মুসলিম, আত-তাময়ীয, পৃ: ১৮৭-১৮৮।

এখানে লক্ষণীয় যে, ইমাম মুসলিম দুই পর্যায়ে তুলনা করেছেন। প্রথমত ইবনু লাহীয়াহর উস্তাদ মূসার অন্য ছাত্র উহাইবের বর্ণনার সাথে ইবনু লাহীয়ার বর্ণনার তুলনা করেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে মূসার উস্তাদ আবনু নাদরের অন্য ছাত্রের বর্ণনার সাথে মূসার দুই ছাত্রের বর্ণনার তুলনা করেছেন। উভয় বর্ণনা প্রমাণিত করেছে যে, ইবনু লাহিয়াহ সনদ বর্ণনায় ও মতন উল্লেখে মারাত্মক ভুল করেছেন।

এভাবেই মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস সংরক্ষণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। একদিকে তাঁরা সনদ সহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে কথিত সকল হাদীস সংকলিত করেছেন।

অপরদিকে বর্ণনাকারীগণের বর্ণনার তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তাদের বর্ণনার সত্যাসত্য নির্ধারণ করে তা লিপিবদ্ধ করেছেন।[63]বিজাল ও জারহ-তা’দীল বিষয়ক সকল গ্রন্থেই এ বিষয় বিবরণাদি সংকলিত রয়েছে। … Continue reading

তাঁদের নিখুত ও বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষা পদ্ধতি ও হাদীসের বিশুদ্ধতা বিষয়ে তাঁদের মতামতকে অবহেলা করা বা নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত সহীহ হাদীসের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে সন্দেহ পোষণ অজ্ঞতার প্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়।

তেমনিভাবে তাঁদের নিরীক্ষা পদ্ধতি ও হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা, বিশুদ্ধতা ও নির্ভুলতার বিষয়ে তাঁদের মতামতকে অবহেলা করে হাদীস নামে যা কিছু সংকলিত বা কথিত হয়েছে সবই গ্রহণ করার প্রবণতাও অজ্ঞতা প্রসূত ও আরো বেশি মারাত্মক। এতে শুধু মুসলিম উম্মাহর মুহাদ্দিসগণের কয়েক শতাব্দীর শ্রমকেই অবজ্ঞা করা হয় না, উপরন্তু কুরআন- হাদীসের নির্দেশ ও সাহাবীগণের কর্মধারা লঙ্ঘন করা হয় এবং ওহী-লব্ধ জ্ঞানের বিকৃতির পথ সুগম করা হয়।

মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে কুরআন কারীম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মান্য করার তাওফীক প্রদান করেন। তিনি আমাদেরকে সাহাবীগণের অনুকরণে হাদীসে রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিশুদ্ধ ও নির্ভুল সংরক্ষণ এবং হাদীসের মধ্যে বিকৃতি ও মানবীয় জ্ঞান-প্রসূত কথার সংমিশ্রণ রোধের জন্য পরিশ্রম করার তাওফীক প্রদান করেন। আমীন!

ফুটনোটঃ

ফুটনোটঃ
1 বিস্তারিত দেখুন: ইরাকী, যাইনুদ্দীন আব্দুর রাহীম ইবনুল হুসাইন (৮০৬হি), আত-তাকয়ীদ ওয়াল ঈদাহ (বৈরুত, লেবানন, মুআসসাসাতুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ৫ম প্রকাশ, ১৯৯৭), পৃ: ৬৬-৭০; ফাতহুল মুগীস (কাইরো, মিশর, মাকতাবাতুস সুন্নাহ, ১৯৯০), পৃ: ৫২-৬৩; সাখাবী, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর রাহমান (৯০২হি), ফাতহুল মুগীস (কাইরো, মাকতাবাতুস সুন্নাহ, ১ম প্রকাশ ১৯৯৫) ১/৮-৯, ১১৭-১৫৫; সুয়ূতী, জালালুদ্দীন আব্দুর রাহমান ইবনু আবী বকর (৯১১হি), তাদরীবুর রাবী (রিয়াদ, সৌদি আরব, মাকতাবাতুর রিয়াদ আল-হাদীসাহ) ১/১৮৩-১৯৪।
2 বিস্তারিত দেখন: খোন্দকার আব্দুল­াহ জাহাঙ্গীর, কুরআন—সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা (ঢাকা, ইশা‘আতে ইসলাম কুতুবখানা, ১ম প্রকাশ, ২০০০) পৃ: ১১—১৫।
3 দেখুন: সূরা ২: আল— বাকারা: ৮০, ১৬৯; সূরা ৩: আল—ইমরান: ৯৪; সূরা ৪: আন—নিসা: ১৫৭; সূরা ৬: আল—আন‘আম: ২১, ৯৩, ১১৬, ১৪৪, ১৪৮; সূরা ৭: আল—আ’রাফ: ২৮, ৩৩, ৩৭, ৬২; সূরা ১০: ইউনূস: ১৭, ৩৬, ৬৮, ৬৯; সূরা ১১: হূদ: ১৮; সূরা ১৮: আল—কাহফ: ১৫; সূরা ২৩: আল—মু’মিনূন: ৩৮; সূরা ২৯: আল—আনকাবূত: ৬৮; সূরা ৪২: আশ—শূরা: ২৪; সূরা ৫৩: আন—নাজম: ২৮, ৩২; সূরা ৬১: আস—সাফ্ফ: ৭।
4 সূরা ৬: আল—আন‘আম: ২১, ৯৩, ১৪৪; সূরা ৭: আল—আ’রাফ: ৩৭; সূরা ১০: ইউনূস: ১৭; সূরা ১১: হূদ: ১৮; সূরা ১৮: আল— কাহফ: ১৫; সূরা ২৯: আল—আনকাবূত: ৬৮; সূরা ৬১: আস—সাফ্ফ: ৭।
5 সূরা—২০: তাহা: আয়াত ৬১।
6 সূরা—২ আল—বাকারাহ: আয়াত ১৬৮—১৬৯।
7 সূরা ৭: আল—আ’রাফ: আয়াত ৩৩।
8 সূরা—৪৯ আল—হুজুরাত : আয়াত ৬।
9 তিরমিযী, মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা (২৭৯ হি), আস—সুনান (বৈরুত, লেবানন, দারু এহইয়াইত তুরাস আল—আরাবী) ৫/৩৩—৩৪; আবু দাউদ, সুলাইমান ইবনু আশ‘আস (২৭৫হি), আস—সুনান (বৈরুত, লেবানন, দারুল ফিকর), ৩/৩২২; ইবনু মাজাহ, মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযিদ (২৭৫ হি.), আস—সুনান (বৈরুত, লেবানন, দারুল ফিকর) ১/৮৪—৮৬; ইবনু হিব্বান, মুহাম্মাদ ইবনু হিব্বান (৩৫৪হি), আস—সহীহ (বৈরুত, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ২য় প্রকাশ, ১৯৯৩) ১/২৬৮, ২৭১, ৪৫৫; হাকিম নাইসাপূরী, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল­াহ (৪০৫হি), আল—মুসতাদরাক (বৈরুত, লেবানন, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৯৯০) ১/১৬২, ১৬৪; হাইসামী, নূরুদ্দীন আলী ইবনু আবী বাকর (৮০৭হি.) মাজমাউয যাওয়াইদ (বৈরুত, দারুল কিতাবিল আরাবী, ৩য় প্রকাশ, ১৯৮২) ১/১৩৮—১৩৯।
10 বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল (২৫৬হি), আস—সহীহ (বৈরুত, দারু কাসীর, ইয়ামাহ, ২য় প্রকাশ, ১৯৮৭) ১/৫২; ইবনু হাজার আসকালানী, আহমদ ইবনু আলী (৮৫২ হি) ফাতহুল বারী শারহু সাহীহিল বুখারী (বৈরুত, লেবানন, দারুল ফিকর) ১/১৯৯, মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬১হি), আস—সহীহ (কাইরো, দারু এহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যা) ১/৯।
11, 12 বুখারী, আস—সহীহ ১/৫২।
13 নববী, ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ (৬৭৬হি), শারহু সাহীহ মুসলিম (বৈরুত, দারু এহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবী, ২য় প্রকাশ, ১৩৯২হি) ১/৬৮, ইবনুল জাউযী, আল—মাউযূ‘আত (বৈরুত, লেবানন, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৫) ২৮—৫৬।
14 ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১৪; আলবানী, মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন, সহীহ সুনানি ইবনি মাজাহ (রিয়াদ, মাকতাবাতুল মা‘আরিফ, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৭) ১/২৯; দারিমী, আব্দুল­াহ ইবনু আব্দুর রাহমান (২৫৫হি), আস—সুনান (দামেশক, দারুল কালাম, ১ম প্রকাশ, ১৯৯১) ১/৮২, হাকিম, আল মুসতাদরাক ১/১৯৪।
15 তিরমিযী, আস—সুনান ৫/১৮৩।
16 আহমদ ইবনু হাম্বাল (২৪১ হি), আল—মুসনাদ (কাইরো, মিশর, মুআসসাসাতু কুরতুবাহ, ও দারুল মা‘আরিফ, ১৯৫৮) ৪/৩৩৪; হাকিম, আল—মুসতাদরাক ১/১৯৬; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৪৪।
17 মুসলিম, আস—সহীহ ১/১২।
18 ইবনু আদী, আহমদ, আল—কামিল ফী দুআফাইর রিজাল (বৈরুত, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৭) ১/১১৫।
19 মুসলিম, আস—সহীহ ১/১২।
20 মুসলিম, আস—সহীহ ১/১০।
21 মুসলিম, আস—সহীহ ১/৯।
22 ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১০—১১; দারিমী, আস—সুনান ১/৮৮; আহমদ, আল—মুসনাদ ১/ ৪৫২; হাকিম, আল—মুসতাদরাক ১/১৯৪; বুসীরী, আহমদ ইবনু আবী বাকর (৮৪০ হি) মিসবাহুয যুজাজাহ (বৈরুত, দারুল আরাবিয়্যাহ, ২য মুদ্রণ, ১৪০৩ হি) ১/৭।
23 হাকিম, আল—মুসতাদরাক ১/১৯৩।
24 ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১১।
25 মুসলিম, আস—সহীহ ১/৪৫।
26 আহমদ, আল—মুসনাদ ২/৮৮; মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬১ হি) কিতাবুত তাময়ীয (রিয়াদ, মাকতাবাতুল কাউসার, ৩য় মুদ্রণ, ১৯৯০) পৃ: ১৭৩—১৭৪।
27 বিস্তারিত দেখুন: ইবনু হাযম, আলী ইবনু আহমদ (৪৫৬ হি), আসমাউস সাহাবাহ আর—রুআত (বৈরুত, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৯৯২
28 ইবনু আদী, আব্দুল­াহ জুরজানী (৩৬৫ হি) আল—কামিল ফী দুআফাইর রিজাল, (বৈরুত, দারুল কুতবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৭) ১/৯৩।
29 ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১২; আলবানী, সহীহ সুনানি ইবনি মাজাহ ১/২৮।
30 ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১১, আলবানী, সহীহ সুনানি ইবনি মাজাহ ১/২৬।
31 বুখারী, আস—সহীহ ৬/২৬৫২; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১৩/২৪৩।
32 বুখারী, আস—সহীহ ১/৫২; ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ১/২০০।
33 ইবনু হাযাম, আসমাউস সাহাবাহ আর—রুআত, পৃ: ৯৫।
34 ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/১১।
35 বালাযুরী আহমদ ইবনু ইয়াহইয়া (২৭৯ হি), আনসাবুল আশরাফ (কাইরো, মুহাম্মাদ আব্দুল হামীদ, ১৯৫৯) ১/১৮৩।
36 আহমদ, আল—মুসনাদ ৩/১৭২।
37 হাকিম, আল—মুসতাদরাক ১/১৯৫।
38 মুসলিম, আস—সহীহ ২/৮৮৬—৮৯২।
39 ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/৩৫২—৩৫৩; বুসীরী, আহমদ ইবনু আবী বাকর (৮৪০হি), যাওয়াইদ ইবনি মাজাহ (বৈরুত, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম প্রমাশ, ১৯৯৩) পৃ: ১৭৩; আলবানী, সহীহু সুনানি ইবনি মাজাহ ১/৩২৯, নং ৯১৯/১১২১।
40 মুসলিম, আস—সহীহ ১/৫০৭।
41 মালিক ইবনু আনাস (১৭৯ হি), আল—মুআত্তা (কাইরো, দারু এহইয়ায়িত তুরাস আল—আরাবী, ১৯৫১) ২/৫১৩।
42 মুহাম্মাদ মুস্তাফা আল—আযামী, মানহাজুন নাকদ ইনদাল মুহাদ্দিসীন (রিয়াদ, মাকতাবাতুল কাউসার, ৩য় মুদ্রণ ১৯৯০) পৃ: ১০।
43 মুহাম্মাদ ইবনু তাহির ইবনুল কাইসুরানী (৫০৭হি), তাযকিরাতুল হুফফায (রিয়াদ, দারুস সুমাইয়ী, ১ম প্রকাশ, ১৪১৫ হি) ১/২।
44 বুখারী, আস—সহীহ ৫/২৩০৫; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১১/২৬—২৭; মুসলিম, আস—সহীহ ৩/১৬৯৪।
45 বুখারী, আস—সহীহ ৬/২৫৩১; ইবনু হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী ১২/২৪৭, মুসলিম, আস—সহীহ ৩/১৩১১।
46 বাইহাকী, আহমদ ইবনুল হুসাইন (৪৫৮হি.), আস—সুনানুল কুবরা (মাক্কা মুকাররামা, সৌদি আরব, মাকতাবাতু দারিল বায, ১৯৯৪) ৪/১৭৮; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/৩২৪—৩২৫।
47 আহমদ, আল—মুসনাদ ২/২, আহমদ শাকির, মুসনাদু আহমদ (কাইরো, দারুল মাআরিফ, ১৯৫৮) ৬/২১৩, নং ৪৪৫৩; হাকিম, আল—মুসতাদরাক ৩/৫৮৪।
48 মুসলিম, আস—সহীহ ৪/২০৫৮—২০৫৯।
49 তিরমিযী, আস—সুনান ২/২৫৭—২৫৮; ইবনু মাজাহ, আস—সুনান ১/৪৪৬।
50 সূরা—৫৭: আল—হাদীস, আয়াত ২২।`
51 আহমদ, আল—মুসনাদ ৬/১৫০, ২৪৬।
52 সূরা ৬: আল—আন‘আম: ১৬৪; সূরা ১৭: আল—ইসরা: ১৫; সূরা ৩৫: ফাতির: ১৮, সূরা ৩৯: আয—যুমার: ৭, সূরা ৫৩: আন—নাজম: ৩৮।
53 মুসলিম, আস—সহীহ ২/৬৪০—৬৪৩, তিরমিযী, আস—সুনান ৩/৩৩৭।
54 সূরা—৬৫: আত—তালাক, আয়াত ১।
55 মুসলিম, আস—সহীহ ২/১১১৮, আবু দাউদ, আস—সুনান ২/২৯৭।
56 মুসলিম, আস—সহীহ ১/১৫।
57 মুসলিম, আস—সহীহ ১/১৩।
58 বাশীর ইবনু কাব ইবনু উবাই রাসূলুল­াহ সাল­াল­াহু আলাইহি ওয়া সাল­ামের সমকালীন ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর সাহচার্য বা দর্শন লাভ করতে পারেন নি। এজন্য তাকে ‘মুখাদরাম তাবিয়ী’ বলা হয়। তিনি একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ ও আবিদ ছিলেন। , যাহাবী, মুহাম্মাদ ইবনু আহমাদ (৭৪৮ হি.), সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা (বৈরুত, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ৯ম মুদ্রণ, ১৪১৩ হি) ৪/৩৫১।
59, 60 মুসলিম, আস—সহীহ ১/১১।
61 তাবারানী, সুলাইমান ইবনু আহমদ (৩৬০হি.) আল—মু’জামুল আউসাত (কাইরো, দারুল হাদীস, ১ম প্রকাশ, ১৯৯৬) ৪/৮৬, নং ৩৪৪৯; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৪৯; যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৭/২০৬, ১১/৫৫৫।
62 মুসলিম, আত-তাময়ীয, পৃ: ১৮৭-১৮৮।
63 বিজাল ও জারহ-তা’দীল বিষয়ক সকল গ্রন্থেই এ বিষয় বিবরণাদি সংকলিত রয়েছে। বিশেষভাবে দেখুন: মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ, কিতাবুত তাময়ীয; ইবনু আদী, আল-কামিল ফী দু‘আফাইর রিজাল, ড. মুহাম্মাদ মুসতাফা আ’যামী, মানহাজুন নাকদ ইনদাল মুহাদ্দিসীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *